• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৫, ১৮ মহররম ১৪৪১

মানব পাচার- সংঘবদ্ধ অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন

লিয়াকত আলী সবুজ

| ঢাকা , শনিবার, ০৬ অক্টোবর ২০১৮

অপরাধের দিক থেকে মানব পাচার হচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধ। শুধু সংঘবদ্ধ অপরাধই নয়। পাচারকারী ও সংশ্লিষ্টরা পাচারের শিকার একজন ভিকটিমের সঙ্গে কয়েক ধরনের অপরাধ সংঘটিত করে। ভিকটিমের সঙ্গে প্রতারণা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, মুক্তিপন আদায়, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা, শ্রমদাসে বাধ্য করা, শরীরের অঙ্গ বিক্রি করা, যুদ্ধে ব্যবহার, এমনকি মেরে ফেলতেও দ্বিধা করে না। বর্তমানে মানব পাচারকে নব্য দাস প্রথার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ওয়ার্ক ফ্রি ফাউন্ডেশনের গত বছর (২০১৭) প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, বিশ্বে ২৪.৯ মিলিয়ন মানুষ নব্য দাস প্রথার শিকার। রিপোর্টে আরও বলা হয়, পাচারের শিকার ভিকটিমদের মধ্যে নারী ও মেয়ে শিশু ৭১ শতাংশ এবং পুরুষ ও ছেলে শিশু ২৯ শতাংশ। বর্তমান বিশ্বে মানব পাচারকে অত্যধিক লাভজনক ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আইএলও এর ২০১৪ সালে প্রকাশিত অন্য একটি রিপোর্টে বলা হচ্ছে, মানব পাচারের মাধ্যমে পাচারকারীরা বছরে ১৫০ বিলিয়ন ডলার আয় করে। যার মধ্যে ৯৯ বিলিয়ন ডলার আয় হয় যৌন পেশায় বাধ্য করার মাধ্যমে।

অভিবাসন প্রক্রিয়ায় মানুষ এক দেশ আরেক দেশ, এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চল বা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের মানুষ ছুটছে উন্নত দেশগুলোতে। আর এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে পাচারকারীরা। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং এশিয়ার কয়েকটি উন্নত দেশ এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও পাচারের শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে এ ধরনের ঘটনার সংবাদ প্রকাশিত হয়। ৫ জুলাই ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাশিয়ায় ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশি দালালেরা ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে মানব পাচারের ফাঁদ পেতেছে। বিশ্বকাপের খেলা দেখার জন্য ফিফা ফ্যান আইডি ব্যবহার করে বাংলাদেশিরা সহজেই রাশিয়ায় প্রবেশ করে। সে জন্য ইউরোপের প্রবেশদ্বার হিসেবে রাশিয়াকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে দালালচক্র। মিথ্যা আশ্বাস ও ভুল তথ্য দিয়ে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়া হয়ে ইউরোপের ইতালি, পোল্যান্ড ও লিথুনিয়া নিয়ে যাওয়ার জন্য চুক্তি করে। এজন্য দালালেরা ইউক্রেন, বেলারুশ ও কালিনিনগ্রাদ রুট ব্যবহার করে। বিশ্বকাপ চলাকালীন রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশ সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সময় সেসব দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে আটক হন বাংলাদেশিরা। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ইউরোপে যাওয়ার আরেকটি রুট ব্যবহার করে পাচারকারীরা। সেটা হচ্ছে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি, গ্রিস ও স্পেন যাওয়ার চেষ্টা। দালালদের খপ্পরে পরে এভাবে ইউরোপ যাওয়ার সময় লিবিয়ায় আটক হয়ে কমপক্ষে ২৮০ জন সে দেশে কারাবন্দী রয়েছেন (২৮ আগস্ট ২০১৮, প্রথম আলো)। এছাড়া তুরস্ক রুটও ব্যবহার করা হয়। মালয়েশিয়ায় উচ্চ বেতনে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের হিসাব মতে ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে বঙ্গোপসাগর দিয়ে পাচার করা হয়েছে। যাদের মধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। উল্লেখযোগ্য মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা নারীদের সিরিয়া, লিবিয়াসহ কয়েকটি দেশে পাচার করছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন নারী ও মেয়ে শিশুরা পাচার হয়ে সেখানকার পতিতালয়ে বিক্রি হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরেও পাচারের শিকার হচ্ছে মানুষ। এ ব্যাপারে সরকার কঠোর আইন প্রণয়ন করলেও বিচারের আওতায় আসছে না পাচারকারী চক্র।

গত ২০ ও ২৮ আগস্ট প্রকাশিত প্রথম আলো পত্রিকার দুটি রিপোর্টে দেখা যায়, মানব পাচারকারী চক্রের হোতা মোহাম্মদ আছেমকে গত ১৪ আগস্ট গ্রেফতার করে পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। ৩ দিন পর আছেম জামিন নিয়ে বেরিয়ে যান। এরপর ১৯ আগস্ট সিআইডি তাকে আবারও গ্রেফতার করে। এবারও তিনি জামিন নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। পুলিশ আশঙ্কা করছে, মোহাম্মদ আছেম বিদেশে পালিয়ে গেছেন। মোহাম্মদ আছেমের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। তিনি রাজধানীর তেজগাঁও কলেজে শিক্ষকতার আড়ালে মানব পাচার করে আসছেন। মোহাম্মদ আছেম ও তার সহযোগীদের ব্যাংক একাউন্টে শত কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য প্রকাশ করে পুলিশ। মানব পাচার দমন ও প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ১৬ ধারা অনুযায়ী, এই আইনের অধীন অপরাধসমূহ আমলযোগ্য, অ-জামিনযোগ্য এবং অ-আপোসযোগ্য। তারপরেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে পরপর দু’বার মোহাম্মদ আছেম জামিন পায় কীভাবে?

মানব পাচার প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণকে মানদ- হিসেবে ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর বিশ্বের ১৮৮টি দেশকে নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। রিপোর্টে দেশগুলোকে চারটি টায়ার বা স্তরে ভাগ করা হয়। যে সব দেশের পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা খুব ভালো তাদের রাখা হয় টায়ার-১ এ। এরপর রয়েছে টায়ার-২, টায়ার-২ ওয়াচলিস্ট ও টায়ার-৩। বাংলাদেশ ২০১২ সালে মানব পাচার দমন ও প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন করার পর থেকে টায়ার-২ তে অবস্থান করছিল। যদিও এর আগে টায়ার-২ ওয়াচলিস্টে ছিল। ২০১৭ ও ২০১৮ সালের প্রকাশিত রিপোর্টে বাংলাদেশকে আবার একধাপ নিচে নামিয়ে টায়ার-২ ওয়াচলিস্টে রাখা হয়। প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানব পাচার নিয়ে একটি কান্ট্রি রিপোর্ট প্রকাশ করে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৬ সাল পর্যন্ত মানব পাচার সংক্রান্ত মামলা আদালতে বিচারাধীন ছিল মোট ২৪৫১টি। ২০১৬ সালে মোট ১৫টি মামলার রায় হয় যার মধ্যে ১টি মামলায় তিনজন আসামি সাজাপ্রাপ্ত হয় এবং বাকি ১৪টি মামলায় ৭২ জন আসামি খালাস পায়। ২০১৬ সালে মানব পাচার সংক্রান্ত মোট মামলা দায়ের হয়েছিল ৬৭৭টি।

মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে পাচার সংক্রান্ত মামলাগুলো পৃথকভাবে পরিচালনার জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হলেও আইন প্রণয়নের অর্ধযুগ পর এখন পর্যন্ত কোন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়নি। প্রত্যেক জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মানব পাচার সংক্রান্ত মামলার বিচার পরিচালিত হচ্ছে। এ সকল ট্রাইব্যুনালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার এত চাপ যে মানব পাচার মামলার বিচার দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আইনে মানব পাচার প্রতিরোধ তহবিল ও জাতীয় মানব পাচার দমন সংস্থা গঠনের উল্লেখ থাকলেও এখন পর্যন্ত তা করা হয়নি। তবে সরকার গত বছর এ সংক্রান্ত তিনটি বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। বিধিমালাগুলো হচ্ছেÑ মানব পাচার দমন সংস্থা বিধিমালা-২০১৭, মানব পাচার প্রতিরোধ তহবিল বিধিমালা-২০১৭, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা -২০১৭।

সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

  • শিক্ষার বাস্তবচিত্র হতাশাজনক

    এসএম মুকুল

    কোচিং বণিকদের মাফিয়া শক্তি হাজার কোটি টাকা পকেট কেটে নিচ্ছে সাধারণ জনগণের। হায়রে বাংলাদেশের শিক্ষার উন্নতি- আফসোস! যদি এমনটিই হবে তাহলে আর শুধু সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে শিক্ষা উন্নয়নের বাহানা করার কি দরকার আছে

  • রৌদ্র ছায়ার খেলা

    হিমাংশু দেব বর্মণ

    মন্তব্য কোনটাই অনৈতিক বা অগ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু আমার মনে হয় সবকিছুর আগে প্রেক্ষাপটটা বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি...