• banlag
  • newspaper
  • epaper

ঢাকা , রোববার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০

 

মিথ্যা মামলা, বিচারক এবং তারপর

সামসুল ইসলাম টুকু

নিউজ আপলোড : ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০

গত ২২ অক্টোবর ‘আমাদের নতুন সময়ের’ মফস্বল পাতায় একটি ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। তা হচ্ছে- মিথ্যা ও বিরক্তিপূর্ণ মামলা করায় মামলার বাদীকে ২০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশ দিয়েছেন রাজশাহী জেলার মোহনপুর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক এমএ সাঈদ শুভ। এছাড়াও আদালতে জাল দলিল উপস্থাপন করায় আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে ওই বাদীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন। জানা গেছে, বিচারক রায় লেখার সময় অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বাদী সিরাজুল ইসলামের আদালতে দাখিলকৃত ৩টি দলিলকে জাল শনাক্ত করে উপরোক্ত রায় দেন।

নিম্নআদালতে এমন ধরনের রায় সম্ভবত এটাই প্রথম। কারণ বিচারককে ঝুঁকি নিয়ে নিজ দায়িত্বে জাল দলিল শনাক্ত করে দলিলের মালিকের এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সহসা চোখে পড়ে না। কোর্টপাড়ায় এ নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়েছে এবং এই সাহসী রায়ের জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। প্রত্যেক বিচারক যদি এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তাহলে দেশের অর্ধেক মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যাবে কয়েক দিনের মধ্যেই। আর এমন মিথ্যা ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে মামলা ও শাস্তি দেয়ার এখতিয়ার বিচারকদের আছে। কিন্তু বিচারকেরা তা চান না বা করেন না।

২০১৭ সালে ‘মিথ্যা, মিথ্যাবাদী, শাস্তির বিধান ও বাস্তবতা’ শীর্ষক একটি বড় প্রবন্ধ লিখেছিলাম, যা স্থানীয় সাপ্তাহিক সীমান্তের কাগজে ছেপেছিল। পরবর্তীতে সেটা আমার লেখা ‘কলম কথা কয়’ বইয়ে স্থান পায়। লিখেছিলাম- ধরুন এক ব্যাক্তি জাল দলিল সৃষ্টি করে আপনার সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে অথবা দখল করার পাঁয়তারা করছে অথবা ভূমি বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীদের সহযোগিতায় টাকা-পয়সা ঢেলে খারিজ করে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ওই জটিলতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আপনাকেই মামলা করতে হবে। সিভিল কোর্টে কাঠখড় পুড়িয়ে ও অর্থ শ্রাদ্ধ করে প্রমাণ করলেন জমিটা আপনারই এবং প্রতিপক্ষ জালিয়াত, তার দলিল খারিজ সবই মিথ্যা ও জাল। আদালত, বিচারক, আইনজীবী, পেশকার, ভূমি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই জালিয়াতির বিষয়টির ব্যাপারে অবগত ছিলেন। এজন্য আদালত স্বপ্রণোদিত জালিয়াতের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। জালিয়াত নিরাপদেই থেকে যায়। বরং জালিয়াতকে মিথ্যা প্রমাণসহ ক্ষতিপূরণের জন্য আপনাকেই পৃথক মামলা দায়ের করতে হবে। আপনি আগেই ৫/৭ বছর মামলা করে ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্লান্ত; তারপরও কি পুনরায় জালিয়াত প্রমাণের জন্য ৫/৭ বছর কোর্টে কোর্টে ঘুরে অর্থ শ্রাদ্ধ করবেন। নিশ্চয়ই না। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়- আপনি মামলা করবেন কার বিরুদ্ধে? জাল দলিল সৃষ্টিকারীর বিরুদ্ধে না খারিজকারী ভূমি বিভাগের বিরুদ্ধে। এ যে কত বড় যন্ত্রণা তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। এবার আরেকটি ঘটনায় আসি। ধরুন আপনার নামে আপনার কোন শত্রু মিথ্যা জামিন অযোগ্য মামলা দায়ের করল থানায় এবং থানায় পয়সা-কড়ি ঢেলে আপনাকে গ্রেফতার করাল। কোন কারণ ও তদন্ত ছাড়াই পুলিশ আপনাকে গ্রেফতার করতে পারে তেমন আইন তো আছেই। এখন আপনি জেলখানায় পচুন ৬ মাস। তারপর হয়তো জমিন পেলেন। ২/৪ বছর মামলা চলল এবং অবশেষে রেহাই পেলেন। আদালত, বিচারক?, পুলিশ সবাই বুঝলো আপনার বিরুদ্ধে মামলাটি মিথ্যা। আপনি ও আপনার পরিবার কষ্ট পেলেন আর্থিক ক্ষতি হলো। কিন্তু মিথ্যা মামলাকারীর কিছুই হলো না। বরং তারা আস্ফালন করবে কেমন ঠ্যালা বুঝেছে, আমার সঙ্গে শত্রুতা। আপনার এই হয়রানির প্রতিকার পেতে আপনাকেই মামলা করতে হবে। শুধু তাই নয়, সাক্ষী-প্রমাণ দিয়ে মিথ্যাবাদীকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করতে হবে। এই পরবর্তী মামলা কেউ করতে যায় না। বরং দাঁতে দাঁত চিপে সব হজম করে নিতে হয়। প্রতিকার পায় না।

যদি বিচারকরা ওই মিথ্যাবাদী জালিয়াতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন তাৎক্ষণিকভাবে, যেমনটা বিচারক এমএ সাঈদ শুভ জালিয়াত সিরাজুলের বিরুদ্ধে শাস্তির রায় দিয়েছেন; তেমনটা হলে এসব মিথ্যাবাদী জালিয়াতরা এমন অপকর্ম করার সাহস পেত না। সমাজে অপরাধ কমে যেত। জনস্বার্থে তথা সমাজের স্বার্থে বিচার বিভাগ বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। আমাদের দেশে জাল দলিল নিয়ে মামলা এবং ফৌজদারি খুন-খারাবির লাখ লাখ মামলা কোর্টে চালু আছে; যা কোর্টের সময় নষ্ট করছে, বিচার কাজ বিলম্বিত করছে, পক্ষ-প্রতিপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর মামলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত উকিল-মহুরি-পেশকার-কেরানি অবৈধ অর্থের মালিক হচ্ছে, সমাজে দুষ্টচক্র দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে, অসহায় অর্থহীনরা সর্বস্বান্ত হচ্ছে। এটাই আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র।

আমি জানি বিচারকরা বলবেন তারা কেন দায়িত্ব ও ঝুঁকি নিতে যাবেন। আমি বলবো তাদের হাতে ক্ষমতা আছে এবং তারাই পারবেন। আর জনসাধারণকে পরনির্ভর হতে হবে, অন্যদিকে অর্থ ও সময়ের ব্যাপার তো আছেই। আর বিচারক মামলা চলতে চলতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। দায়িত্ব ও ঝুঁকি নিশ্চয়ই কাউকে নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিচারকদের বিকল্প কেউ হতে পারবে না। অথবা বাদী হোক বা আসামি হোক সে মিথ্যা ও জালিয়াত প্রমাণ হলেই শাস্তির বিধান রাখতে হবে। এজন্য পৃথক মামলার দরকার যেন না হয়।

[লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট]

sangbad ad