• banlag
  • newspaper
  • epaper

ঢাকা , রোববার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০

 

একাত্তরের বিভীষিকা এবং করোনা

রণেশ মৈত্র

নিউজ আপলোড : ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০

করোনা তার ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়ে তার আগমনীর অষ্টম মাস পার করছে। বাংলাদেশে করোনা মহামারীতে মৃতের সংখ্যা বহু দেশের চেয়ে কম হলেও যাদের ইতোমধ্যেই হারালো তাদের নামের তালিকা দেখলে একাত্তরের মতই আঁতকে উঠি। মনে পড়ে যায় ১৪ ডিসেম্বরের কথা-যে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকেই আমরা শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে প্রতি বছর পালন করে আসছি।

একাত্তরেও মার্চ থেকে ওই বর্বর হত্যালীলার সুরু হয়েছিল-চলেছিল ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এবারে, এই ২০২০ সালেও, নির্মমতার সাক্ষাৎ মেলে মার্চ থেকে। ডিসেম্বর এখনও আসেনি। কিন্তু এই আট মাস সময়কালের মধ্যে যাদেরকে আমরা হারিয়েছি-তাদের তালিকার দিকে চোখ মেললে আঁতকে না উঠে পারা যায় না। ওইদিন যে কয়জন শীর্ষ বুদ্ধিজীবীর তালিকা সংবাদপত্রগুলো প্রতি বছর আজও তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশ করে আসছে-এই অক্টোবর, ২০২০ পর্যন্ত করোনার নির্মমতায় হারানো শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা তার চাইতে অনেক বড়। একাত্তরে বাড়ি থেকে বুদ্ধিজীবীদের মুখোশ পরে রাতের অন্ধকারে ধরে অন্যত্র নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এবার যেন করোনা মুখোস (মাস্ক) পড়েই আসছে। যার প্রাণ সে হরণ করবে তিনিও মাস্ক পরে বাড়িতে বা হাসপাতালে আছেন। কোয়ারেন্টিনে বা আইসোলেশনে মাস্ক পরে থাকা সত্ত্বেও করোনা ঠিকই চিনে নিচ্ছে তাদের ।

আবার লোকান্তরিত ওই বিদগ্ধজনদের একাত্তরে যেমন ভয়ে যেমন তাদের শেষকৃত্য করতে পারেনি-এ ২০২০ এ এসে ঠিক তেমনই স্বজন শুভাকাক্সক্ষীরা পারছেন না তাদের শেষকৃত্যাদিতে শরিক হতে। এটি, আমার মনে হয়, একাত্তরের চেয়েও ভয়াবহ কারণ সেদিনকার বুদ্ধিজীবীরা ঘরে বসে হলেও ওই অবরুদ্ধ বাংলাদেশে থেকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে লেখালেখি করেছিলেন বা ক্ষেত্র বিশেষে নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করছিলেন কিন্তু এবারে তো তা না। এবারে তো ওই অর্থে বাংলাদেশ অবরুদ্ধ না কেউ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধও করছে না-তাই সে কাজে কাউকে সহায়তাও করছিলেন না। তবু ঘটলো-ঘটছে-ঘটেই চলেছে নির্বিচারে।

১৯৭১ এ হত্যালীলার সমাপ্তি ঘটেছিল ডিসেম্বরে-এবার তার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে যে হত্যালীলা শুরু হয়েছে তা যে ডিসেম্বরে সমাপ্ত হবে তার কোন সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতে করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গ আরও অনেক ভয়াবহতা নিয়ে হাজির হতে পারে। ইউরোপে শীত চলছে সেখানে নতুন করে সৃষ্ট ভয়াবহতা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কাকেই সত্য বলে প্রমাণ। করছে। দ্বিতীয় ঢেউ আরও অনেক দেশকে ইতোমধ্যেই আঘাত করেছে।

এবারে পেছন ফিরে তালিকাটা দেখি, বাঙালি জাতির আলোর দিশারী যাদের ইতোমধ্যেই হারিয়েছি তাদের তালিকাটা-

১। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, যিনি তার প্রজ্ঞা, লেখনী, দেশপ্রেম, সাহস দিয়ে বাঙালি জাতিকে সারা জীবন উজ্জীবিত অনুপ্রাণিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে বড় ভূমিকা রেখেছেন, ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, সাহসের সঙ্গে মৌলবাদের বিরোধিতা করেছেন। স্বয়ং আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে কুখ্যাত এক যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং ফলে নিজেও তাদের টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন। সেই অসাধারণ গুণসম্পন্ন হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার শিক্ষক-জাতীয় অধ্যাপককে গ্রাস করল করোনা।

২। জিয়াউদ্দিন তারিক আলী। প্রচার বিমুখ বহুমুখী প্রতিভা সম্পন্ন এই মুক্তিযোদ্ধাকে গত ৭ সেপ্টেম্বর কেড়ে নিলো করোনা তার প্রিয় স্বদেশ ও স্বজনদের কাছ থেকে। ১৯৬৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী আটজনের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। রাজধানী ঢাকার শেরে বাংলা নগরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন বিশাল ভবন নির্মাণের বহুমুখী কাজের তিনি ছিলেন প্রধান সমন্বয়ক। এর অবকাঠামো ও কর্মধারার সব স্তরের জড়িয়ে আছে তার হাতের ছোঁয়া।

১৯৭০ সালে জিয়াউদ্দিন তারিক আলী গণসঙ্গীতের দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে রাজপথে গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি সীমান্ত পাড়ি দেন এবং মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী দলের সদস্য হয়ে তিনি শরণার্থী শিবির, মুক্তিযোদ্ধাদের শিবির, মুক্ত এলাকাগুলোতে গানের মাধ্যমে উদ্দীপ্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি।

এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন ওই আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্ট-প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

করোনাকালীন সময়ে আরও যাদের বাঙালি জাতি হারিয়েছে তাদের তালিকায় রয়েছেন

জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী-যিনি যমুনা বহুমুখী সেতু এবং নির্মীয়মান পদ্মা সেতু প্রকল্পের উপদেষ্টার ভূমিকায় থেকে প্রকৌশলী হিসেবে অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের দুই নায়ক সেক্টর কমান্ডার সি.আর দত্ত ও সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী, এটর্নী জেনারেল মাহবুবে আলম, রাজনীতিক মোহাম্মদ নাসিম, নারীনেত্রী রাখি দাস পুরকায়স্থ, গীতিকার আলাউদ্দিন আলী, বিজ্ঞানী অধ্যাপক আলী আসগর, শিল্পী-ভাষাসৈনিক মুর্তজা বশির, কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর, স্থপতি মৃণাল হক, অধ্যাপক রিয়াজুল ইসলাম এবং এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হলেন খ্যাতনামা কথা সাহিত্যিক রশীদ হায়দার এবং বিশিষ্ট কবি ও গবেষক অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন জাহেদী।

এ যাবত এই ১৭ জনের নাম জানতে পেরেছি। আরও হয়তো কেউ কেউ আছেন যাদের নাম স্মরণে আনতে পারছি না।

বাঙালি জাতি করোনায় এবং করোনা কবলে এই যে তাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারালেন, জাতির দুর্ভাগ্য, বাঙালি সংস্কৃতি অনুযায়ী তাদের জানাযা, শ্রাদ্ধ প্রভৃতিতে ঐতিহ্য অনুসারে হাজারে হাজারে আমরা সমবেত হতে পারিনি। পারা যায়নি তাদের শ্রাদ্ধের আয়োজন করতে-সম্ভব হয়নি তাদের জন্য কোন স্মরণ সমাবেশ আয়োজন করতে।

তবে কি এক বা দুই বছর পরে ইতোমধ্যে আরও যাদের হারাবো সেসব প্রিয়জনদের গণহারে স্মরণসভা করব-যদি তার মধ্যে করোনাভাইরাস থেকে আমরা সবাই মুক্তি পেতে পারি।

পৃথিবীর অন্য কোন দেশে করোনায় ও করোনাকালে এত বেশি সংখ্যক বিশিষ্টজনদের কি হারিয়েছে?

এখন অতঃপর কি করা? আমরা কি কোন অলৌকিক ক্ষমতার ভরসায় থাকব? ওই অদৃশ্য কোন ক্ষমতা এসে করোনা প্রতিরোধ করবে-মানুষ বাঁচাবে? এমন কোন ধারণা যদি আমরা একজনও মনের কোণে পোষণ করি তবে মারাত্মক ভুল করব।

আজ বাঙালি সংস্কৃতির যে বিপর্যয় করোনা সৃষ্টি করেছে-সেই বিপর্যয়ের হাত থেকে আমরা আমাদের, আমাদের সবাইকে না সম্ভব হলেও বেশিরভাগ লোককে বাঁচানো সম্ভব হয়। এ কাজটি করতে পারে একমাত্র বিজ্ঞান। বিজ্ঞান যেদিন নির্ভরযোগ্য প্রতিরোধ এবং প্রতিষেধক আবিষ্কার করবে এবং তা সহজলভ্য হবে তখনই একমাত্র আমরা রেহাই পাব।

বৈজ্ঞানিকেরা সে গবেষণা চালাচ্ছেন বহু দেশে। কোন কোন দেশ দাবি করছে তারা চূড়ান্তভাবে মানবদেহে প্রয়োগে সফল হলেই ব্যাপক পরিমাণে উৎপাদন করে দেশ-বিদেশের বাজারে পৌঁছাবেন। কিন্তু জানা যাচ্ছে না ঠিক কত দিনে ওই প্রতিরোধক-প্রতিষেধক ঠিক ঠিক কখন মানুষের দুয়ারে পৌঁছাবে। কেউ কেউ নিশ্চিত করতে চাইছেন-আগামী ২০২১ সালের প্রথম দিকে তা সম্ভব হবে কিন্তু নিশ্চিত করে তা বলা যাচ্ছে না।

তা হলে যতক্ষণ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার চূড়ান্ত না হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না ওই আবিষ্কার পৃথিবীর সব দেশের মানুষের ঘরে না পৌঁছায়-ততক্ষণ তো বসে থাকা যাবে না। বাঁচার জন্য লড়াই চালিয়ে যেতেই হবে। আর সে দায়িত্ব ব্যক্তির, পরিবারের, সমাজের এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের। এই চার অংশের একটি অংশও যদি নিষ্ক্রিয়, সিস্পৃহ থাকেন তবে মানুষের বাঁচার নিশ্চয়তা খুবই কম-যদি জোরদারভাবে শীতকালীন দ্বিতীয় ধাক্কা আশঙ্কা অনুযায়ী সত্যিই বাড়ে।

প্রথমত; ব্যক্তিগতভাবে সবাই মাস্ক পরিধান করা। মানুষে মানুষে দুই গজ দূরত্ব রক্ষা করে চলা। যতটা সম্ভব পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। কোথাও ভিড় তৈরি না করা। ব্যবসায়ীদের পাড়া-মহল্লায় রিকসা ভ্যানে শাকসবজি তরি-তরকারি মাছ তেল ডাল প্রবৃতি রোজ সকলে বিক্রিতে উৎসাহিত করা। সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে এগুলি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব সর্বাধিক। যত কথাই বলা হোক, এ যাবত এ ব্যাপারে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে ব্যর্থ হয়েছে। তাই ওই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তা দূর করতে যথেষ্ট সময় হাতে রেখে করোনা প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমার বিবেচনায় ব্যবস্থাগুলো হওয়া উচিত নিম্নরূপ:-

এক. উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিদিন ন্যূনতম নির্দিষ্ট-সংখ্যক (প্রতি উপজেলায় এ সংখ্যা প্রতিদিন ২০০ হতে পারে) মানুষের করোনা টেষ্ট করার কিটস সরবরাহ করা;

দুই. প্রতি জেলায় পিসিআর ল্যাব অবিলম্বে স্থাপন করা;

তিন. প্রতি জেলার সরকারি হাসপাতলে করোনা ওয়ার্ড স্থাপন করে অন্তত: ২৫ বেড, উপযুক্ত সংখ্যায় চিকিৎসক, নার্স ও অপরাপর স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা;

চার. প্রতিটি সরকারি জেলা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অক্সিজেন ও অন্তত: আটটি করে আইসিইউ স্থাপন করা;

পাঁচ. করোনা পরীক্ষার জন্য যাবতীয় ফি প্রত্যাহার করে নেওয়া;

ছয়. বাড়ির বাইরে মাস্ক ছাড়া বের হলে জনপ্রতি কম পক্ষে ১,০০০ টাকা করে জরিমানা আদায় করার জন্য সর্বত্র ভ্রাম্যমাণ আদালত স্থাপন করা;

সাত. জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মাস্ক পরিমাণ ও সমাবেশ জটলা বন্ধে টহল পুলিশের ব্যবস্থা করা;

একাত্তরে আমরা জানতাম বাঙালির শত্রু কারা এবং সেই শত্রুরা-যেমন হানাদার-বাহিনীর সদস্যরা, রাজাকার-আলবদরেরা এবং শান্তি কমিটিার লোকেরা ছিল দৃশ্যমান। তাই তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং বিজয়ী হতে পেরেছিলাম মাত্র ৯ মাসের মধ্যে।

কিন্তু এবারের শত্রু একটি ভাইরাস, যা দৃশ্যমান নয়। তাই তাকে পরাস্ত করতে সময় লাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তাই কামনা করব, বিজ্ঞানীরা সত্বর সফল হবেন এবং মানুষ বাঁচাতে সর্বত্র মানুষের কাছে প্রতিরোধক প্রতিষেধক সহজলভ্যভাবে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন।

নিজে বাঁচতে হবে, পরিবারকে বাঁচাতে হবে, বন্ধু-বান্ধবসহ গোটা সমাজ ও দেশকেও বাঁচাতে হবে।

[লেখক : সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ]

raneshmaitra@gmail.com

sangbad ad