• banlag
  • newspaper
  • epaper

ঢাকা , বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯

 

‘শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসী’

মোহাম্মদ আবু নোমান

নিউজ আপলোড : ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভালোবাসা সেটাই, যে অপরকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই প্রাণ উৎসর্গ করেন। তেমনিই একজন হুসনে আরা! নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল-নূর মসজিদে ঘটনার সময় হুসনে আরা নারীদের জন্য সংরক্ষিত কক্ষে ছিলেন। আকস্মাৎ গুলি আর হৈ-চৈয়ের শব্দে তার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। স্বামী যে কক্ষে নামাজরত সেখানে প্রায় ১৫ মিনিটব্যাপী চলছে গুলি আর গুলি! হুইল চেয়ারে চলাচলকারী প্রাণপ্রিয় স্বামীর খোঁজে পাগলপাড়া হয়ে বেরিয়ে আসেন গুলিকে উপেক্ষা করে। এ সময় অস্ত্রধারী হুসনে আরাকে লক্ষ্য করে গুলি করলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। একটি মানুষ এত ভয়ঙ্কর হতে পারে তা সত্যিই কল্পনা করা যায়? এই সন্ত্রাসী একবার গুলি করে গিয়ে আবার ফিরে এসে গুলি করেছে। যারা তখনও নড় ছিল তাদেরও গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এমনকি বাইরের একজনকে দুইবার গুলি করেছে এবং ৩য়বার তার কাছে গিয়ে মাথায় গুলি করেছে।

নিউজিল্যান্ড এমনই শান্তিপূর্ণ দেশ, যেখানে পুলিশ অস্ত্রশস্ত্রই সঙ্গে রাখে না। তাদের প্রধানমন্ত্রীও নাকি নিরাপত্তা নেন না। শান্তির দেশেও সরকার ব্রেন্টেনের মতো ভয়ানক, অথচ ঠান্ডা মানসিকতার খুনিকে একে ৪৭-এর লাইসেন্স দিয়ে রাখে এবং সে ইচ্ছেমতো গুলি কিনতে পারে দোকান থেকে? অস্ত্র নিয়ে গাড়িতে ঘুরে বেড়ানো যায়? অস্ত্র এত সহজলভ্য? বন্দুক হাতে বিনা বাধায় দীর্ঘ সময় ধরে এরকম হত্যালীলা চালানোর ‘স্বাধীনতা’ দেখে পুরো বিশ্ব হতবাক! কিন্তু সব মৃত্যুই সমান নয়! বন্দুক হাতের লোকটি যদি সাদা না হয়ে কালো বা বাদামি হতো, হতো মুসলমান; তবে তাদের ধর্মান্ধ বলায় কোন কসুর করত না অধিকাংশ পশ্চিমা গণমাধ্যম। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীও হত্যাকারীকে জঙ্গি বর্ণবাদী সন্ত্রাসী বলেননি বটে, তবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আপন করে নিতে চেয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায় এর দ্বারা শ্বেত উগ্রতাবাদ বিস্তৃত হচ্ছে, সে কথার প্রমাণ হয় না বলে মনে করেন তিনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন একটি জঘন্য ঘটনার পরেও তার স্পষ্ট নিন্দা করতে ব্যর্থ হলেন।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন বলেছেন, তার দেশের অস্ত্র আইনে পরিবর্তন আনা হবে। আরর্ডান আরও বলেন, ‘হামলাকারীর কাছে ৫টি বন্দুক ও ১টি লাইসেন্স ছিল। তার কাছে পাওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে দুটি সেমি-অটোমেটিক (স্বয়ংক্রিয় রাইফেল), দুটি শটগান ও লিভার অ্যাকশন ফায়ারআর্ম।’ ইতিপূর্বে নিউজিল্যান্ডে ডেভিড গ্রে নামের এক বন্দুকধারী গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যা করেছিল। শান্ত দেশ হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ডে বিভিন্ন মানুষের হাতে থাকা বন্দুকের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এ হিসাব দেশটির পুলিশের। এর অর্থ হলো, দেশটির প্রতি ৩ জন মানুষের একজনের অস্ত্র আছে! প্রশ্ন হলো একজন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক নিউজিল্যান্ডে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র পায় কীভাবে? নিউজিল্যান্ডে (শান্তির দেশে) এত সহজভাবে অস্ত্র ও স্বাধীনভাবে মানুষ মারা যায়!

ক্রাইস্টচার্চের আল-নূর মসজিদে গুলির ঘটনার পর শহরতলির লিনউডের মসজিদে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়। দুই মসজিদে তিন বাংলাদেশিসহ ৫০ জন নিহত হন। হামলার ভিডিও দেখে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারী নিজেই পুরো ঘটনা লাইভ ভিডিওর প্রস্তুতি হিসেবে তার মাথায় ভিডিও ক্যামেরা বসায়ে নিয়েছিল। প্রশ্ন আসে, ২০ মিনিটব্যাপী হামলা ও ভিডিও চলছিল তখন পুলিশ কি করেছে? ক্রাইস্টচার্চের স্থানীয় গণমাধ্যম দ্য প্রেস ও নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় ভয়ঙ্কর চিত্র। ওই প্রত্যক্ষদর্শী অজুর ঘরে বসেই জরুরি সেবায় ফোন করেন। কয়েকবার পুলিশকে ফোন দেন। তবে কাউকেই ফোনে পাননি। শেষে অ্যাম্বুলেন্স সেবায় ফোন দিয়ে বিপদের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘এখানে ভয়ঙ্কর হত্যাকান্ড চলছে। দয়া করে সাহায্য করুন। পুলিশ পাঠান, তারা গুলি করেই যাচ্ছে।’ বন্দুকধারী বলছে, ‘মুসলমান তোদের আজ আমরা খুনই করে ফেলব।’

নিউজিল্যান্ড উন্নত দেশের মধ্যেই পড়ে। ক্রাইস্টচার্চ ছোট্ট একটি শহর। জনসংখ্যাও বেশি নয়। সেখানে একজন খুনি ২০ মিনিট ধরে একটি মসজিদে হামলা করে পরে অপর মসজিদে হামলা করল। পুরো হামলার ঘটনা খুনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ টেলিকাস্ট করেছে, সারা বিশ্ব সেই লাইভ টেলিকাস্ট দেখেছে, অথচ নিউজিল্যান্ডের পুলিশ দেখলো না!

ক্রিকেট বিশ্বের হর্তাকর্তারা তাদের কর্তব্য পালনে কতটা যে উদাসীন, নিউজিল্যান্ডের ঘটনায় তার প্রমাণ। অল্পের জন্য ওই হামলা থেকে বেঁচে যান বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যরা। কোন দেশের একটি জাতীয় দলকে শূন্য নিরাপত্তায় রাখা যায়? সেখানে বাংলাদেশ দলের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা কেন ছিল না বিসিবি ও আইসিসিকে জবাব দিতে হবে। আইসিসি এমন অনিরাপদ ক্রিকেট সফর কেন করে থাকে? বাংলাদেশের জায়গাতে ইন্ডিয়া হলে আজকে আইসিসির ঘাম ছুটে যেত। নিজেদের নিরাপত্তার কথা আমাদের নিজেদেরই ভাবতে হবে। ভবিষ্যতে আমাদের জাতীয় ক্রিকেট দলের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে আইসিসির কোন টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করবে না, সেটা বিশ্বকাপ হলেও না। আইসিসি কী নিউজিল্যান্ডকে বিদেশি দলের সফরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে? যে রকম পাকিস্তানের বেলাতেও ঘটেছে।

ভাবা যায়! আজ যদি হামলাকারীর উদ্দেশ্য থাকতো আমাদের ক্রিকেটারদের ওপর আক্রমণ করার, তবে কি কেউ বেঁচে ফিরতে পারত? কোন ধরনের নিরাপত্তা ছাড়া কীভাবে একটা দল অন্য দেশে যেতে পারে? আমাদের দেশে তো আমাদের রাষ্ট্রপ্রতির সমান নিরাপত্তা দেয়া হয় অন্য দেশের ক্রিকেটারদের। কিন্তু আমাদের বেলায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় কি বিসিবি, আইসিসি এড়াতে পারবে? নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া পুরু টিমের হোটেল থেকে বের হওয়া। তার মানে রাস্তায় এবং শুধু বাসে নয় হোটেলেও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। ঘটনার পর, গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায়, নিরাপত্তাবলয় ছাড়া পায়ে হেটে ড্রেসিং রুমে ফিরে আসাটা তো রীতিমতো ভয়ঙ্কর লাগছে।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায় বাংলাদেশ আজ একটি মহাদুর্যোগ ও জাতীয় শোক থেকে রক্ষা পেল। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী ক্রিকেটারদের যে কোন প্রতিযোগিতায় রাষ্ট্রের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে নিরাপত্তা সদস্য পাঠানোর প্রয়োজন। পাশাপাশি খেলার আয়োজনকারী দেশের নিকট থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা আদায় করে নিতে হবে।

২০০৬ সালে মুসলমানদের অবমাননা করে কার্টুন প্রকাশ করেছিল নিউজিল্যান্ডের পত্রিকা এবং টেলিভিশন। শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান দ্বারা ইতিপূর্বে মার্কেটে ও শিশুদের স্কুলে নির্বিচারে গুলি করে হত্যার ঘটনা রয়েছে। তখন বলা হয়েছে মানসিক ভারসাম্যহীন, ওর চিকিৎসা জরুরি! ওই স্থানে লোকটি যদি হতো মুসলমান? তাহলে এটা নির্ঘাত জেহাদি, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিপনার ষড়যন্ত্র বলা হতো! অথচ ‘সন্ত্রাসী’ পরিচয় শুধু যেন মুসলমানদের জন্যই বরাদ্দ! আর সবসময়ই পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিমরাই সন্ত্রাসী, জঙ্গি হিসেবে খবরের শিরোনাম হয়ে থাকে। পিস্তল, বন্দুকসহ বিভিন্ন মরণাস্ত্রের লোভনীয় ব্যবসার বেশিরভাগেরই মালিক পশ্চিমা বিশ্ব। ওদের অনেকেই আবার মস্ত বড় দানবীর। বন্দুক হাতে যারা মানুষ মারতে আসে, তারা ওই সব ব্যবসারই ক্রেতা-বিক্রেতা। যারা ইরাকে, আফগানিস্তানে, সিরিয়ায়, সোমালিয়ায়, ইয়েমেনে, তুরস্কে, লিবিয়ায়, চীনের উরুঘুয়ে বা রাখাইনে মানুষ হত্যা করে আসছে, তাদের পেছনে পাওয়া যাবে ওইসব কোম্পানি ও ওইসব মহান নেতাদের লম্বা লম্বা হাত। একটা মুসলিম দেশ আছে কি, যাদের অর্থনীতি অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল? মুসলমানরা কি ইউরোপ আমেরিকায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, নাকি কোন দেশ দখল করতে গেছে?

পথভ্রষ্ট কোন মুসলমান দ্বারা একটি খারাপ কাজ ঘটে থাকলে, তাকে যেভাবে ফোকাসে নিয়ে আসা হয়, ঠিক তার উল্টোটি করা হয় পশ্চিমা বা খ্রিস্টানদের বেলায়। ইদানীং কি বৌদ্ধরাও কম যাচ্ছে। কিন্তু মিডিয়াতে এস্টাবলিস্ট করা হয়, মুসলমানরাই জঙ্গি। ৯/১১ এর হামলার সময় টুইন টাওয়ারে কাজ করা সহস্রাধিক ইহুদির কেউই সে সময়ে অফিসে ছিল না। অসংখ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম পর্যবেক্ষক ও গবেষকগণ বলেছেন, ৯/১১ এর ঘটনা অমুসলিমদের সাজানো একটি নাটক। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত আইএসও অমুসলিমদের তৈরি!

মুসলিমদের ওপর আইয়ামে জাহেলিয়াত থেকে এ পর্যন্ত প্রথম হামলা কিন্তু অমুসলিমদের থেকেই শুরু হয়েছে। ১৯৪৮, ’৬৭, ’৭৩ ও ’৮২ সালে ইসরায়েল, ১৯৫৬ সালে মিসরে, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানে, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ১৯৯১ সালে পুরো বাগদাদ শহর আমেরিকা মিসাইল ও বোমা মেরে ধ্বংস করছিল। এর আগে আফগানিস্তানে প্রথমত সোভিয়েত ইউনিয়ন পরবর্তীতে আমেরিকার হামলার খবর সবারই জানা। কোনও মুসলিম দেশ এখনও আমারিকা আর পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেনি। পশ্চিমারা পুরো সিরিয়া, ইরাক, মিসর, আফগানিস্তানের কতগুলো শহর ধ্বংস করেছে? নিউজিল্যান্ডের এ ঘটনা প্রমাণ করছে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে জাতি ও বর্ণ ঘৃণার শিকার মানুষ হিসেবে মুসলমানদের অসহায়ত্ব কত বেড়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো বিশ্বের কোন তথাকথিত ‘নিরাপদ’ দেশই আর মুসলমানদের জন্য নিরাপদ নেই। পশ্চিমাদের পৌনপুনিক ইসলামবিরোধী অপপ্রচারই এ ধরনের ইসলামবিরোধী বর্ণবাদি সন্ত্রাসবাদের অন্যতম কারণ।

এফবিআই ডেটাবেইসের একটা প্রতিবেদন দেখা যায়, ১৯৮০-২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ঘটা মাত্র ৬ শতাংশ সন্ত্রাসী ঘটনায় মুসলিম সন্ত্রাসীরা জড়িত ছিল। এছাড়াও ‘গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০১৮’-এর গবেষণায় এসেছে যুদ্ধাক্রান্ত সিরিয়াকে বাদ দিলে ২০১৬-১৭ সালেও বিশ্বের মোট সন্ত্রাসী ঘটনার বেশিরভাগই ঘটেছে অমুসলিমদের দ্বারা। ২০১১ সালে অ্যান্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক নামের এক ব্যক্তি নরওয়েতে গুলি ও বোমা ফাটিয়ে ৭৭ জনকে হত্যা করেন। এর আগে নিজের ব্লগে তিনি মুসলিমবিদ্বেষী কথাবার্তা লেখেন। নরওয়ের মতো নিউজিল্যান্ডও শান্তির দেশ বলে পরিচিত। ব্রেইভিককে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী বলেননি সে দেশের আদালত। নিয়মিতভাবে পাখির মতো করে স্কুল-কলেজের বাচ্চাদের হত্যা করা মার্কিন ঘাতকেরাও নিতান্তই ‘অসুস্থ’ বলে প্রচারিত হয়ে থাকে।

ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, ক্রাইস্টচার্চে হামলাকারী ব্রেনটন বলছেন, অনেক জাতীয়তাবাদী সংগঠন তাকে সমর্থন করেছে এবং ডোনেট করেছে?। তিনি ইউরোপীয়দের উদ্দেশে বলেছেন, ‘পুরুষরা আবার পুরুষ হও। রাজনৈতিক সমাধানের কথা বাদ দাও। প্ল্যান কর, ট্রেনিং নাও, অস্ত্রসজ্জিত হও, আর হামলা করো।’ এমনতর হামলা তার সঙ্গী-সাথীদের মাধ্যমে নাকি চলমান থাকবে!

বিগত সময়ে বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাঠামোগত ঘৃণাচর্চা ও নির্যাতনের যে রেওয়াজ দেখা যাচ্ছে, তারই আন্তমহাদেশীয় সম্প্রসারিত রূপ কি এই হামলা? হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত সন্ত্রাসী তার ইশতেহারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘শ্বেত আত্মপরিচয় ও অভিন্ন আদর্শের একটি প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যদি ইতিপূর্বে ট্রাম্পের নিজের কথাতেও অনেক সময় মুসলিমবিদ্বেষ ধরা পড়েছে।

বিপদের কথা, হামলাকারীর ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট মেনিফেস্টো’ মাসের পর মাস অনলাইন, ফেসবুক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরেছে। অথচ গোয়েন্দা, পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী, চিন্তক, ভাবুক, এফবিআই, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ইত্যাদিরা কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিল? এই মুসলিম-নিধন মেনিফেস্টোটির আদলে একই রকম একটি অমুসলিম-নিধন মেনিফেস্টো অনলাইনে এলে এরাই কি হাজার গুণ সক্রিয় প্রতিক্রিয়া দেখাত না? যদি কোন মুসলিম এ রকম মেনিফেস্টো দিত? প্রতিক্রিয়া কী হতো ভাবতেই গা কাঁটা দিয়ে ওঠে না?

সন্ত্রাসী ব্রেনটন একজন হোয়াইট সুপ্রেমেসিস্ট। হোয়াইট সুপ্রেমেসিস্টরা মনে করেন, পৃথিবীতে শ্বেতাঙ্গরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। তাদের কেউ ডোমিনেট করতে পারে না। অন্যরা বরং তাদের নমস্য মনে করবে। হামলার মাসখানিক আগেই এই শ্বেতাঙ্গ খুনিটি মেনিফেস্টো প্রকাশ করেছিলেন। ৭৪ পৃষ্ঠার এ ইশতেহারে খুনিটি জানিয়েছেন, তিনি সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন আর তার বাবা-মা স্কটিশ-আইরিশ ইংরেজ। তিনি জেনে বুঝেই এ হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তার সঙ্গে আরও অনেকেই আছেন তবে শেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীদের জন্য তিনি নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে যেতে চান। প্রায় দুবছর আগে থেকেই তিনি হামলার প্ল্যান করছেন, আর এমনতর হামলা তার সঙ্গী-সাথীদের মাধ্যমে চলমান থাকবে। এটাও জানিয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাপোর্টার।

শ্বেত সন্ত্রাসী ব্রেনটন টারান্ট আদালতে দাঁড়িয়েও হাতকড়ায় বন্দী হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনী মিলে বৃত্ত তৈরি করেন। এটি দেখতে ‘পি’ আকৃতির, যা পাওয়ার বা শক্তি বুঝিয়ে থাকে। বাকি তিনটি আঙুল এ সময় ‘ডব্লিউ’এর রূপ নেয়, যা দিয়ে শ্বেতাঙ্গদের বোঝানো হয়। অর্থাৎ, হোয়াইটের আদ্যক্ষর। এই প্রতীকের অর্থ দাঁড়ায়, সাদা চামড়ার লোকজনই সেরা।

হামলাকারী নিজেই পুরো ঘটনা লাইভ ভিডিও করেছিলেন। সেই লাইভ ভিডিওর একপর্যায়ে হামলাকারী তার দর্শকদের আরেক চরম মুসলিম বিদ্বেষী পিউডিপাইকে অনুসরণ করতে উৎসাহিত করেন। সুইডিশে ব্যাপক জনপ্রিয় ইউটিউবার, কমেডিয়ান, ধারাভাষ্যকার ফেলিক্স কজেলবার্গ সবার কাছে ‘পিউডিপাই’ নামেই পরিচিত। এ পিউডিপাই একজন জাতিবিদ্বেষী ব্যক্তিত্ব। বহুদিন থেকেই দক্ষিণ এশীয়দের প্রতি ব্যাঙ্গাত্মক এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে আসছে বিদ্রƒপের নামে। তার অনেক ভিডিওতেই তিনি ইসলাম বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন।

ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু ভোগ বিলাসের ধর্ম নয়। এই হামলায় মুসলমান বিচলিত নয়। সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানের পাশাপাশি আরাকান, কাশ্মীর, ফিলিস্তিনকে বহুকাল যাবৎ জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। এসব জ্বলন্ত জনপদ নিয়ে জাতিসংঘসহ মানবাধিকারগোষ্ঠী আজও প্রতিরোধযোগ্য কিছু করতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে মহৎ উদ্দেশ্যহীন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যে জনগোষ্ঠী তৈরি করছে, তা অর্থনৈতিক ব্যাপক উন্নয়ন করলেও মানবিক সমাজ সৃষ্টি করছে না। শিক্ষাব্যবস্থায় দক্ষতা, উদ্যোক্তা, কারিগরিবিদ্যা যত বাড়ছে, নৈতিক অনুশীলন তত গুরুত্ব হারাচ্ছে। তাই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সব শান্তিপ্রিয় নেতাদের উচিত, শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসীদের নিন্দা করা। তাদের সহিংস ঘৃণা যেভাবেই হোক থামিয়ে দেওয়া।

abunoman1972@gmail.com

দৈনিকা সংবাদ : ১৯ মার্চ ২০১৯, মঙ্গলবার, ৭ এর পাতায় প্রকাশিত

সংস্কৃতির মূলধারা সঙ্কুচিত হচ্ছে

দেশে সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ দিন দিন কমছে। সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদারি, জবাবদিহি ও আন্তরিকতার অভাব। সংস্কৃতি

সাত দশকে আওয়ামী লীগের অর্জন ও ব্যর্থতা

২৩ জুন ২০১৯ আওয়ামী লীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আওয়ামী লীগ এ উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন দল। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও শেখ হাসিনা

১১ জুন বাঙালি জাতির জীবনে একটি রেড লেটার ডে। আজ থেকে ১১ বছর আগে ২০০৮ সালের এই দিনে (১১ জুন) সেনাসমর্থিত

sangbad ad

জিয়া-মঞ্জুর হত্যা এবং এরশাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’ অর্থাৎ একেবারে না হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হওয়াটা ভালো। বিলম্বে হলেও বিচার

চিনি শিল্পে সংকট ও উত্তরণ

সময় মতো আখ বিক্রির টাকা না পেয়ে ক্ষোভে-দুঃখে জমি থেকে আখ উপড়ে ফেলেছেন জয়পুরহাট চিনি কলের কৃষক। আখের বদলে আবাদ

চুকনগর গণহত্যা দিবস : গণহত্যার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে চুকনগরের মাটি

image

২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তখনও ঢাকাসহ কয়েকটি

জাহানারা ইমাম নিরলস যুদ্ধ করেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে

দিল মনোয়ারা মনু

image

আমাদের দেশে যখন মুক্তিযোদ্ধারা সূর্যরশ্মির মতো ছড়িয়ে পড়েন সবখানে, মুক্তিযুদ্ধে যখন হয়ে ওঠেন এক অবিনশ্বর আকাশ, যেখানে

জঙ্গিদের পরবর্তী লক্ষ্য কোন দেশ!

রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশকিছু ওলোট-পালটের ঘটনা ঘটছে। শিগগিরই আরও কিছু ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। মারাত্মকভাবে হতাশায় নিমজ্জিত দলগুলোতেই

এক বাগানের ফুল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জাপান নতুন যুগে পদার্পণ করতে চলেছে। আড়ম্বরের সঙ্গে আয়োজন করা হচ্ছে- জাপানের ভাবী সম্রাট নারুহিতো

sangbad ad