• banlag
  • newspaper
  • epaper

ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

 

বিপ্লবী চার সহযোদ্ধা স্মরণে

রণেশ মৈত্র

নিউজ আপলোড : ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

অ্যাডভোকেট হরিসাধন দেবব্রহ্ম নামক দরিদ্রজনদের বিশ্বস্ত বন্ধুকে কিছুদিন হলো আমরা হারিয়েছি। তিনি চট্টগ্রামের সন্তান। আমাদের সবার অহংকার। হরিসাধনকে ভুলে যাওয়া তো দূরের কথা, ভুলে থাকাও অত্যন্ত দুরূহ। পেশায় হরিসাধন সুপ্রিমকোর্টের একজন আইনজীবী। সে হিসেবে গভীর ঘনিষ্ঠতা ছিল বাংলাদেশের জীবিত দিকপাল আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের সঙ্গে। এ দুইজনের চেম্বারে হরিসাধন যেতেন আপন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নয়, অক্ষম মানুষদের জন্য আইনি সাহায্য চাইতে। তারাও অক্লান্তভাবে দাঁড়াতেন হরিসাধনের পাশে। এ দরিদ্রজনদের মামলার ব্যয় নির্বাহ করতে অক্ষম মানুষদের কোর্ট ফি, দরখাস্ত টাইপ করা থেকে খুঁটিনাটি যা ন্যূনতমভাবে একটি মামলা শুরু করতে প্রয়োজন তাও বহন করতে অক্ষম জানলে যেভাবেই হোক তা সংগ্রহ করে মামলা দায়ের করতেন হরিসাধন। মামলা পরিচালনা করে দরিদ্র আইন সাহায্য প্রার্থীর আইনি বিজয় নিশ্চিত করতে শতভাগ সৎ পথে থেকে পরিশ্রম করতেন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর যাবত।

কিন্তু আইনজীবী হরিসাধন যত বড় তার চাইতে অনেক বড় তার দেশপ্রেম, মানবপ্রেম। পরিপূর্ণ আত্মপ্রচার বিমুখ হরিসাধনের সঙ্গে ন্যাপের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রথম পরিচয়। বেশ অনেক দিন আগের কথা। হঠাৎ একদিন হরিসাধন বলে বসলেন, ‘রণেশ দা, আপনার জেলায় কি পান চাষ হয়? বললাম অবশ্যই হয় কিন্তু কেন? পানচাষীদের অনেক সমস্যা আছে। সরকার সমস্যাগুলোর সমাধান করছে না। তাই পানচাষী সমিতির পাবনা জেলা শাখা খুলতে তাদের সঙ্গে চাক্ষুষ আলোচনা করতে চাই। বললাম, তথাস্তু।’

হঠাৎ একদিন পেয়ে গেলাম হরিসাধনের চিঠি। তাতে দিন তারিখ উল্লেখ করে সীমিত আকারে পাবনা জেলা পান চাষ সমাবেশের আয়োজন করতে অনুরোধ জানিয়েছে। সে অনুযায়ী আয়োজনও করা হলো। কৃষক সমিতি নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কারণ এটা তাদেরও কাজে আসবে। পানচাষীরাও তো এক অর্থে কৃষক; জমিতে পাতা জন্মায়-সেই পাতাকে আমরা পানপাতা বলি। দেশে-বিদেশে তার বিপুল চাহিদা।

কৃষক সমিতির কেউ এলেন না। দু’তিন ঘণ্টা আলোচনার পর পানচাষী সমিতির পাবনা জেলা কমিটি গঠন করা হলো। কিছু দায়িত্ব পালনেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কিছুদিন কিছু সাংগঠনিক কাজকর্ম চালানোর পর কেন্দ্রীয় জেলা পর্যায়ে সমিতিটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় সংগঠনটির অনানুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটল মূলত কর্মীর অভাবে।

কিন্তু হরিসাধন নিরুৎসাহিত হন না। চির আশাবাদী হরিসাধন বিত্তহীন, নিম্নবিত্তদের সংগঠন না থাকলে নিজ উদ্যোগে নানা সংগঠন গড়ে তুলতেন। সংগঠনের আর্থিক সমস্যা নিজের পকেট থেকেই মেটাতেন- ছোটখাটো ব্যাপারে যদি প্রয়োজনীয় কয়েকটি টাকা নিজ পকেটে থাকে। না হলে সহানুভূতিশীলদের কাছে হাত পাততেন। ওকালতিতে নিজের সামান্য রোজগারের পূরো টাকাটাই এসব কাজে ব্যয় করতেন গরিবের স্বার্থে। ফলে সংসার হতো মারাত্মকভাবে বঞ্চিত। হয়তো বা উপার্জনের টাকা গরিবের কাজে ব্যয় করে বাসায় এসে অভুক্ত স্ত্রীসহ পুরো সংসারটাই অনাহারে রাত কাটাতে বাধ্য হতো।

মৃত্যুর দিন দশেক আগে বহুকাল পর হরিসাধনের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ ঘটে ঢাকায় ঐক্য ন্যাপের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডল, জীর্ণশীর্ণ রোগাক্রান্ত দেহ। তাই চিনতে পারছিলাম না। বিষয়টা উপলব্ধি করেই ঐক্য ন্যাপের সভাপতি জননেতা পংকজ ভট্টচার্য্য পরিচয় করিয়ে দিলেন কিন্তু বিশ্বাস হতে চাচ্ছিল না যে এ মানুষটি সেই বহু পরিচিত ও অত্যন্ত আপন চির চঞ্চল, সহযোদ্ধা হরিসাধন দেবব্রহ্ম। অনেকটা উৎকণ্ঠিত চিত্তেই কুশলবিনমিয় করলাম। বস্তুত হরিসাধন এসেছিলেন পংকজবাবুর কাছেই কোন বিশেষ প্রয়োজনে। তার প্রয়োজনীয় কাজ সেরে অমনি ফিরে গেলেন। বুঝিনি চিরতরে চলে যাওয়ার আগের বিদায়ী সাক্ষাৎ হবে সেটা। কিন্তু তাই হলো। হারালাম আরও একজন বিপ্লবী সহযোদ্ধাকে।

মীর ইকবাল হোসেন

পূরো নাম মীর মো. ইকবাল হোসেন। বাড়ি বগুড়া শহরে। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে ১৯৫৩ সালের শেষ দিকে গিয়েছিলাম বগুড়ার ছাত্র ইউনিয়নের কাজ দেখতে। বগুড়াতেও তখন একজন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন যার নাম দুর্গাদাস মুখার্র্জী। মুখার্জীকে চিনতাম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়াতে। কিন্তু আরও অনেক নেতা কর্মীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটেছে বগুড়া গিয়ে। তাদেরই একজন মীর ইকবাল।

সদর উদ্দিন নামে মেডিকেলের এক ছাত্র ছিলেন বগুড়া জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। গোপনে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক সদা-সক্রিয় দুর্গাদাস মুখার্জী। মনে পড়ে, একটি স্কুলঘরে হয়েছিল কর্মিসভা। বর্ধিত আকারে থাকলেও প্রায় সমসংখ্যক কর্মী দাঁড়িয়ে সভার বক্তব্য শুনছিলেন। সে এক বিশাল সংগঠন। বলা চলে চোখ ধাঁধাঁনো। অথচ ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাই তো বায়ান্নর শেষের দিকে। এত অল্প সময়ে এত বৃহৎ সংগঠন কী করে গড়া হলেÑ জানতে চাইলাম। দুর্গাদাসের উত্তর, কোন জাদুমন্ত্র নেই বগুড়াতে সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে। রাজনীতিকে প্রাধান্য না দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ও শিক্ষাব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি ও সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করি আমরা। যে স্কুলঘরে কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই স্কুলটি পরিচালনা করি আমরা। বগুড়াতে ছাত্র ইউনিয়ন এমনই আরও ৪টি অর্থাৎ মোট ৫টি ¯ু‹ল পরিচালনা করে থাকে। বিনা বেতনে গরিবের সন্তানদের বই-খাতা, সেøট-পেনসিল প্রভৃতি ছাত্র ইউনিয়ন মানুষের কাছে থেকে চাঁদা তুলে সরবরাহ করে থাকে। এগুলো ছাড়াও এ জাতীয় আরও কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ফলে ছাত্রসমাজ ও অভিভাবকদের বিপুল সমর্থন-সহযোগিতা আমরা পেয়ে থাকি। আর একই কারণে বাছাই করে আমরা সংগঠনের কর্মী নেতা তৈরি করি। রাজনৈতিক ক্লাস? গোপনে পরিচালনা করা হয় বাছাই করা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে।

এভাবে গড়ে তোলা নেতৃস্থানীয় কর্মী বাহিনীর বিশিষ্ট একজন মীর ইকবাল হোসেন। তখন নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্র। ছাত্র ইউনিয়নের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালকও। নিজে গড়া প্রাথমিক পর্যায়ের ছেলেমেয়েদেরও একটি স্কুলে ৪-৫ জন করে শিক্ষক বিনা পারিশ্রমিকে পড়ান। তারা নিজেরাও উচ্চশ্রেণী বা কলেজে পাঠরত এবং সবাই ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃস্থানীয়।

ফলে সম্ভব হয়েছিল ছাত্র ইউনিয়নকে গণ-ছাত্র সংগঠনে পরিণত করা। অসাম্প্রদায়িক যে কোন দলের সমর্থকের সদস্য হতে কোন বাধা ছিল না। রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি সংগঠন হিসেবে ছাত্র ইউনিয়ন তখন করেনি। তবে উৎসাহিত করেছে সকল প্রকার সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী এবং সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী ক্রিয়াকর্মকে। ১৯৫৩ সালের শেষদিকে এসে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সামরিক চুক্তি সই করল পাকিস্তান। সেই মুহূর্তে সমগ্র পূর্ববাংলায় ছাত্র ইউনিয়ন দাবি তুলল, সেøাগানে সেøাগানে মুখরিত করে তুলল ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক, পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল কর।’ কেন এ দাবি ছাত্র ইউনিয়ন নেতাকর্মীরা দেশব্যাপী সভা-সমিতি মিছিল করে জানিয়েছেন? এ চুক্তির ফলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ক্ষতি হয়েছে।

ফলে এ দাবি জনপ্রিয়তা অর্জন করে ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক-রাজনৈতিক শক্তিও অনেকখানি বৃদ্ধি পায়। বগুড়ার ক্ষেত্রে মীর ইকবাল ও অন্যান্য নেতারা ছিলেন এসব দাবিতে সোচ্চার এবং তাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যুক্তিসমৃদ্ধ বক্তব্য দিতে অসাধারণ নৈপুন্য সম্পন্ন।

আবার ভালো ছাত্র এবং ভালো বক্তা হিসেবেও সুনাম কুড়াতে সক্ষম হয়েছিল মীর ইকবাল হোসেন। কিছুকাল পরেই আরও একটি দাবি সংযোজিত হলো সিয়াটোসেন্টো চুক্তি বাতিল কর। ওই চুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবং বাগদাদ চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এশিয়ার আফ্রিকার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হরণ করেছিল।

মাস্টার্স ও আইন (এলএলবি) পাস করে ওকালতি পেশায় নিয়োজিত হন ইকবাল। এই পেশাতেও অল্প সময়ের মধ্যে তিনি দক্ষতা অর্জন করেন এবং জেলা পর্যায়ের একজন প্রথম শ্রেণীর আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সমর্থ হন। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলে ইকবাল ন্যাপের বগুড়া জেলা কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। রুশ-চীন দ্বন্দ্বের ফলে ন্যাপ বিভক্ত হলে তিনি মস্কোপন্থি ন্যাপের বগুড়া জেলা কমিটির অন্যতম নেতা নির্বাচিত হন।

পরবর্র্তীতে ন্যাপের আরও বিভক্তি হলে ইকবাল রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে একপর্যায়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন কিন্তু আওয়ামী লীগারদের কাছে তিনি ন্যাপ নেতাই থেকে যান।

অতঃপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত গঠিত হলে ইকবাল ওই আদালতের একজন প্রসিকিউটর নিয়োজিত হন। বেশ কয়েকটি মোকদ্দমা অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনার পর প্রসিকিউটরদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কলহ সৃষ্টি হওয়া মাত্র তিনি পদত্যাগ করেন।

কর্মব্যস্ত প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব মীর ইকবাল হোসেন মাত্র কয়েক দিন আগে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। হারালাম দুজন ঘনিষ্ঠ বিপ্লবী সহযোদ্ধাকে।

ডা. কাজী রবিউল হোসেন

দু’জনের প্রসঙ্গে লেখা শেষ করতে না করতেই পেলাম আর এক বিপ্লবী সহযোদ্ধা ডা. রবিউল হোসেনের মৃত্যু সংবাদ। তিনি যশোরের বাসিন্দা। শেষ দিনগুলো কাটালেন নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়ে। রবিউলও আমার বয়োকনিষ্ঠ এবং যতদূর মনে পড়ে একেবারে প্রাক-মাধ্যমিক ছাত্র থাকাকালেই (পঞ্চাশের দশকে) ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। নিজের কর্মগুণে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদও পেয়ে যান।

ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ডাক্তারি পড়েন এবং এমবিবিএস পাস করে একাধারে ডাক্তারি এবং পার্টির কাজে অব্যাহতভাবে দীর্ঘদিন নিয়োজিত থাকার পর শুরু হয় তার রোগাক্রান্ত জীবনের। ইতোমধ্যে কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করে যশোর শহরের বাসিন্দা হন। যশোর রবিউলের পৈতৃক শহর কিনা আমার জানা নেই, তবে জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে তিনি যশোরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিষ্ঠাশীল বিপ্লবী বন্ধু ও সহযোদ্ধা হিসেবে এতটাই কাছাকাছি ছিলাম যে, তাকে ভুলতে পারব না বহুদিন।

আনোয়ারুল হক

গত ৩০ জানুয়ারি সকাল ৯টায় পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক শিবজিত নাগের পাঠানো মেসেজ থেকে জানতে পারলাম ওই দিন সকাল ৯টার দিকে আমার বাল্যবন্ধু পাবনার প্রবীণ সাংবাদিক আনোয়ারুল হক মৃত্যুবরণ করেছেন। আনোয়ার আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ষাটের দশকের শুরুতে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে মুক্তির জন্য কারাগারের অফিস কক্ষে আনার পর ডেপুটি জেলার একটি ওহারঃধঃরড়হ ঈধৎফ আমার হাত দিলেন। খুলে দেখি আনোয়ারের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র। খুবই ভালো লাগলো এই ভেবে যে, বন্ধুটির জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তে পাবনাতে গিয়ে অংশ নিতে পারব।

অতঃপর কারামুক্তির দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে মেইন গেট খুলে দেয়া হলো। কিন্তু এ কি? সামনেই পুলিশের এক বিরাট বহর। সাদা পোশাকের একজন ছিলেন পুলিশের কাছাকাছি। আমি জেল ওয়ার্ডারকে বললাম, রাজশাহী রেলস্টেশনে যাওয়ার জন্য একটি রিকশা ঠিক করে দিতে। অমনি সাদা পোশাকধারী ম্যাজিস্ট্রেট এসে জানালেন, একটু থামতে হবে। প্রশ্ন করি ‘কেন? আপনাকে তো চিনলাম না।’ উনি ম্যাজিস্ট্রেট বলে পরিচয় দিতেই গোয়েন্দা কর্মকর্তাসহ একজন পুলিশ অফিসার এসে বললেন, ‘রণেশ বাবু, আপনাকে গ্রেফতার করা হলো।’ বললাম, ‘মুক্তির পর আমি তো জেলখানা এলাকার বাইরেই যেতে পারিনি। এর মধ্যে আবার কি অপরাধ করলাম?’ জবাবে বলা হলো ‘আজকেই আপনি এৎড়ঁহফং ফবঃবহঃরড়হ পেয়ে যাবেন-তখন জানতে পারবেন।’ আবার কারান্তরাল, তবে পুলিশ সঙ্গে নিয়ে কাছাকাছি চায়ের দোকানে গিয়ে এক পেয়ালা কফি খেয়ে মুক্তির সামান্য স্বাদ নিয়ে আবার ঢুকে পড়লাম জেল ওয়ার্ডে। দেখি যে ইতোমধ্যেই খাট এবং বিছানাপত্র এনে ঠিক মতোই সাজানো আছে। মনটা খারাপ লাগল, আনোয়ারের বিয়েতে যোগ দিতে না পারার জন্য।

আনোয়ার রাধানগর মজুমদার একাডেমির ছাত্র। বায়ান্নার ভাষা আন্দোলনের মিছিলে হাজারও ছাত্রের সঙ্গে সেও অংশগ্রহণ করে। পরে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেয়। স্বল্পভাষী, প্রচার বিমুখ, সততার প্রতীক বন্ধু আনোয়ারকে চিনতে আমরা ভুল করিনি।

আনোয়ার শৈশবেই পিতৃহারা এবং সংসারের বেশ ক’জন ভাইবোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হওয়ায় সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধেই বর্তায়। কায়ক্লেশে সংসারটা চালিয়ে নিয়েছে সে। হঠাৎ করে মা, মেজো ভাই, তারপর সেজো ভাই সংসারের মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে গেলে আনোয়ার মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। যা হোক, ইতোপূর্বেই ম্যাট্রিক পাস করে ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার পাবনা শাখায় চাকরি পাওয়াতে সমস্যাগুলো কমে আসে, যদিও তা যথেষ্ট ছিল না।

আনোয়ার ছোটবেলায় সিনেমা দেখায় খুবই অভ্যস্ত ছিল। এ ব্যাপারে তার সাথী ছিল তার বন্ধু আনসারুল ইসলাম। আর একটু বড় হলে আনোয়ার খুবই বই পড়তো বিশেষ করে উপন্যাস। অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরির নিয়মিত পাঠক ছিল সে।

পাবনার প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান শিখা সংঘ, উদীচী, জাহেদুর রহিম স্মৃতি পরিষদ, জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদসহ পাবনার সব প্রগতিমুখী সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও কর্মকর্তা ছিলেন আনোয়ার।

ছাত্র ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে, ছাত্রজীবন শেষ হলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দেন এবং সম্ভবত ’৭০-এর দশকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদও লাভ করেন। কোনদিনই আনোয়ার কোন রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেননি, তবে অত্যন্ত আগ্রহী শ্রোতা ছিলেন।

আনোয়ারুল হকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য জীবন হলো সাংবাদিকতার। শহীদ সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেনের স্নেহধন্য আনোয়ার ১৯৬১ সালের মার্চে ইত্তেফাকের পাবনার সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্তিতে কিছু ভূমিকা রেখে ছিলাম বটে! কিন্তু নিয়োগের স্থায়িত্ব বিধানে তার যোগ্যতাই মুখ্য। তিনি পাবনা প্রেসক্লাবের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও পরে পাবনার ভুট্টা আন্দোলনের কারণে আনোয়ার দীর্ঘদিন কারাজীবন অতিবাহিত করেন।

আমার আগেই চিরবিদায় নেয়া এবং শেষ সাক্ষাৎ না হওয়ার বেদনা আমাকে পীড়িত করবে আজীবন। আনোয়ারের অপর বৈশিষ্ট্য ছিল তার নিখাঁদ অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা। বন্ধু আনোয়ারের অমর আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক। আনোয়ার ও অপর তিনজন বিপ্লবী সহযোদ্ধাকে লাল সালাম।

[লেখক : সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত]

(প্রকাশিত- ৪ ফেব্রুয়ারি, ৬ এর পাতায় : সংবাদ)

অর্থনীতিতে নতুন রূপান্তর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণাকালে

প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে পরিবেশ দূষণের ইস্যুটি উপেক্ষা করা যাবে না

পরিবেশের দূষণ বাড়ছেই। বেশ কিছু সূচকে অগ্রগতি সত্ত্বেও জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে

ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া ও তার স্বপ্নের রূপপুর

image

রূপপুর এখন স্বপ্ন পেরিয়ে বাস্তবে। আজ বাস্তবায়নের পথে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প।

sangbad ad

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নিয়ে কিছু কথা

প্রীতি ভালোবাসা কোনদিন বিফলে যায় না। শত ধারায় তা ফিরে আসে নিজের কাছেই। বৃষ্টির ধারা, ঝরনার

ভাষা আন্দোলনে মুন্সীগঞ্জ

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি, ছেলেহারা শত মায়ের

খালেদা জিয়ার উত্থান এবং

বিএনপি চেয়ারপারসন দেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কারাবাসের এক বছর

অপার সম্ভাবনাময় ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম

image

বিশ্বব্যাপী প্রতিদিনই উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে প্রযুক্তি। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে দুনিয়া। সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে প্রচলিত ও প্রথাগত অনেক কিছুই। সর্বত্র

sangbad ad