• banlag
  • newspaper
  • epaper

ঢাকা , সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯

 

খেলাপিদের সুবিধা এবং টাইম ভ্যালু

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

নিউজ আপলোড : ঢাকা , শনিবার, ০৬ এপ্রিল ২০১৯

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী দেশের ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করেছেন। মাননীয় মন্ত্রিমহোদয়ের ঘোষণা থেকে জানা যায়, খেলাপিরা যদি তাদের খেলাপি ঋণের ২ শতাংশ পরিশোধ করেন তাদের ঋণের সুদের হার কমিয়ে দেয়া হবে। মন্ত্রী তার ঘোষণায় খেলাপি ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করে দিয়েছেন সাত শতাংশ হারে। যদিও ২-৪-১৯ তারিখে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সূত্রের খবর থেকে জানা যায়, তা হবে ৯ শতাংশ। মন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেছেন খেলাপিদের মধ্যে যারা ভালো তারাই এ সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

ঘোষিত ভালো খেলাপি কারা, বিষয়টি প্রশ্নবোধক, কারণ খেলাপিরা আবার ভালো হয় কি করে? সকারের খেলাপি ঋণী ভালোমন্দ নির্ধারণ করার বিষয়টি অনেকটা লাল মিয়া আর কালো মিয়ার গল্পের মতো। লাল মিয়া যদি এতই কালো হয় তাহলে আর কালা মিয়াকে দেখার দরকার নাই। খেলাপিদের মধ্যে মন্দ ভালো নির্ধারণের পর মন্দ খেলাপি ঋণীর স্বরূপটা কি ধরনের হতে পারে তা দেশের মানুষও অনুমান করতেও পারবে না। কারণ খেলাপিদের মধ্যে ভালোমন্দ নির্ধারণের সূচকগুলো কি কি হবে? যার মাধ্যমে ভালো মন্দ নির্ধারণ করা যাবে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা প্রয়োজন। যিনি খেলাপি হয়েছেন তিনি নিশ্চয়ই ভালো নন। কারণ দেশের বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহিতাদের ঋণ আদায়ের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক অনেক সুবিধা দেয়া হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে পুনঃতফসিল করা হয় তারপরও যদি কেউ প্রদান করতে না পারলে তাতেও আবার পুনঃপুন তফসিলের সুবিধা থাকে, তারপরও রয়েছে স্টাকচারাল সুবিধা। এত সব সুবিধা পেয়েও যারা খেলাপি হয়েছেন তাদের ভালো মন্দ যাচাইয়ের সূচকগুলো প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। তবে সরকারে এ ধরনের সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের জন্য সুফল বয়ে আনবে না বরং এ রকম সিদ্ধান্তের জন্য খেলাপির সংখ্যাই দিন দিন বাড়বে কিন্তু খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমবে না। কারণ সাত বা ৯ শতাংশ সুদ সুবিধা পাওয়ার আশায় খেলাপি হওয়ার প্রবণতাটা বেড়েই যাবে।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, খেলাপিরা মে মাসের মধ্যে তাদের খেলাপি ঋণের ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট প্রদান করলে বাকি ঋণ ১২ বছরের মধ্যে পরিশোধ করার সুযোগ পাবে। এভাবে ডাউনপেমেন্ট প্রদানকারী খেলাপি ঋণী পাবেন ৭ শতাংশ হারে সুদ সবিধা। ৭ শতাংশ হারের সুদ চক্রাকারে নির্ধারিত হবে না তা হবে সরল হারে। তবে গত ২ এপ্রিল, ২০১৯ অর্থমন্ত্রী এ সুদের হার ৯ শতাংশ করার কথা ঘোষণা দিয়েছেন এই ৯ শতাংশ সুদও আদায় করা হবে সরল হারে। এ খেলাপিরা ঋণ গ্রহণ করেছেন ১০-১২ শতাংশ হারে এবং গৃহীত ঋণের সুদ চক্রবৃদ্ধি হারের নির্ণয় পদ্ধতিতে। সরকারের এ সিদ্ধান্তে কোটি কোটি টাকার ঋণখেলাাপিরা বড় অঙ্কের সুদের বিষয়টিতেই মওকুফের সুবিধা পেল।

২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার তথ্যমতে জানা যায়, ২০০৯ সালে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২,৪৮১ কোটি টাকা। ২০১৮ সাল শেষে তার পরিমাণ এসে দাঁড়ায় ৯৯,৩৭০ কোটি টাকায়। ২০১৯ সালের এ কোয়ার্টার হিসাবে করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। গত ১০ বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় পাঁচগুণ। বছরভিত্তিক খেলাপির ঋণের টাকার হিসাবটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই খেলাপি ঋণীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি খেলাপি ঋণের পরিমাণের গ্রাফ থেকে জানা যায় যে, ২০০৯ সালে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২,৪৮১ কোটি টাকা, ২০১২ সালে সেই ঋণ এসে দাঁড়ায় ৪২৭২৫ কোটি টাকায়, ২০১৫ সালে তা হয় ৫১,৩৭১ কোটি ২০১৮ সালের শেষে তা হয়ে গেলে ৯৯,৩৭০ কোটি টাকায়। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি থাকার পর ব্যাংকগুলো আদায় করতে পারছে না এ রকম খেলাপি রয়েছে, যে ঋণ তা অবলোপন করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ হলোÑ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ঘোষিত খেলাপি ঋণ এবং অবলোপিত ঋণ যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি প্রায়।

বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত এবং প্রচারিত তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সেই সঙ্গে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমান দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা। বর্তমানে সরকার যে পদ্ধতিতে খেলাপি ঋণ আদায় করতে যাচ্ছেন তাতে ফল কতটা ভালো হবে তা সবারই জানা। এ আদায়কৃত অর্থ অনর্থেই পরিণত হবে। খেলাপি হওয়া সমুদয় ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল ১০-১২ শতাংশ হারে এবং এ সুদ নিরুপিত বা সুদ হিসাব করা নিয়ম হলো চক্রবৃদ্ধি হারে। সরকার এই সুদের হার ৩ শতাংশ কমালেন সেই সঙ্গে সুদ নির্ণয় পদ্ধতিটা করেছে সরল হারে। তাই যোগ বিয়োগে সরকারের লাভ না হয়ে ক্ষতিই হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

সরকারের এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মে মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণের ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট করলে খেলাপিরা এ সুবিধা ভোগ করতে পারবে। সরকারের ঘোষিত সুবিধায় একজন খেলাপি তার ঋণ পরিশোধের সময় পাবেন ১২ বছর। দেশের মূল্যস্ফীতির হার ৬-৭ শতাংশ। ১২ বছর পর এক লাখ কোটি টাকা Time Value of method G Calculate করলে দেখা যাবে, এক লাখ কোটি টাকা মূল্যমান এসে দাঁড়াবে প্রায় ৪০-৩৫ হাজার কোটিতে, অপর দিকে সরল হারে ৯ বা ৭ শতাংশ হারে সুদ আদায়ে কতটা এ বিপুল পরিমাণ টাকার অবমূল্যায়ন স্থিতিশীল রাখতে পারবে তা দেখার বিষয়। কারণ Time Value of method এ টাকার অবমূল্যায়ন পদ্ধতি হিসাব করা হয় চক্রবৃদ্ধি হারে সুতরাং সরল হারে আদায়কৃত সুদের টাকার অবমূল্যায়িত টাকার পরিমাণের চাইতে কম হওয়াটাই স্বাভাবিক। সুতরাং এ ঘোষণায় মূলধন ঘাটতিই হবে। খেলাপি ঋণ যেমন অর্থহীন ঠিক তেমনিই আদায়কৃত খেলাপি ঋণও অর্থহীন হয়ে যাবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়টির ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে একটি ঘটনা মনে পড়ে গেলে। ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকের ঘটনা। অর্থনীতি বা টাকার মূল্যায়ন ও অবমূল্যায়ন সে বিষয়টি সম্পর্কে সেই সময় আমার তেমন কোন ধারণা ছিল না। পাশের বাড়ির বৃদ্ধ দাদু তার ট্রাংকের ভেতর ১৯৭২ সালের একটি ১০০ টাকার নোট পেলেন। ১৯৭২ সালে রেখেছিলেন হয়ত মনের ভুলে বা অন্যান্য কাগজপত্রের নিচে পড়ে থাকায় তা খরচ করা হয়নি। প্রায় এক যুগ পর দাদু টাকাটা পেলেন, ওই সময়টায় দাদুর আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না, তাই টাকা পাওয়ায় তার মেয়ে মহাখুশি। কিন্তু দাদু খুশি হতে পারলেন না। কেন দাদু খুশি হলেন না তা ওই সময় ভালো করে বুঝতে পারি নাই। টাকার নোট দুমড়ে-মুচড়ে গেছে গ্রামের বাজারে দোকানিরা এ নোটটার বিনিময়ে ১০০ টাকা দিতে চাইল না, তারা ১০ টাকা কম দিল। দাদু তার মেয়ের খুশি দেখে বললেন, পুরনো টাকা পেয়ে এত খুশি হওয়ার কিছু নাই, এই নোটটা যদি ১৯৭২ সালে কাজে লাগানো যেত তাহলে বর্তমানের চেয়ে ১০ গুণ বেশি উপকার হতো। বললেন, এ ১০০ টাকা দিয়ে ১৯৭২ সালে প্রায় দু কাঠা জমি কেনা যেত আর বর্তমানে এ টাকা দিয়ে এক ছটাক জমিও পাওয়া যাবে না। টাকার টাইম ভ্যালুটা সেদিন আমার মাথায় ঢুকেছিল না। গ্রামের একজন নিরক্ষর বৃদ্ধা সময়ের সঙ্গে টাকার মান যেভাবে মূল্যায়ন করতে পেরেছিল তা আজ আমরা নির্ণয় করি Time Value of method G। একজন সময় সাক্ষীর কাছ থেকে সব সবঃযড়ফ শেখার বিষয়।

বাংলাদেশের হাতে গোনা কয়েকজন খেলাপির কাছে দেশের বিশাল অঙ্কের টাকা আজ পড়ে আছে যদিও এ খেলাপি ঋণের টাকা সরকার আদায় করতে পারে বর্তমানে নেয়া পদক্ষেপে তাহলে এ আদায়কৃত অর্থ অবমূল্যায়িত হয়ে তলানিতে ঠেকবে। এ আদায়কৃত অর্থ দিয়ে তেমন উপকার হবে না। রাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোর Revolving loan fund-এর পরিমাণ কমবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের গৃহীত সুবিধা সমষ্টিক অর্থনীতির উন্নতি ঘটাবে না।

সরকারকে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হওয়ার প্রয়োজন। অর্থ আইনগুলো ফৌজদারি দন্ডবিধির মতো করা উচিত। খেলাপি ঋণবিষয়ক বিষয়টি দেউলিয়াত্ব বিষয়টির মধ্যে না রেখে ফৌজদারি দন্ডবিধির ৩০২ ধারার মত মৃত্যুদন্ড হতে পারে সে রকম কিছু সংযোজন করা দরকার। সুযোগ দিলে অনেকেই ইচ্ছা করেই খেলাপি হবে। বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সুযোগ পাওয়ায় খেলাপির সংখ্যা বাড়ছে। তাই এ বিষয়ে আর সুযোগ দেয়াটা অনুচিত এবং ঠিক হবে না। সুতরাং রাষ্ট্রের মূলধন জনগণের সম্পদ আর তাই জনগণের সম্পদ হেফাজতকারীদের কঠোর হওয়া প্রয়োজন। খেলাপি ঋণ কমাতে সরকারের উচিত খেলাপি ঋণ আদায়ে ফৌজদারি দন্ডবিধির মতো দন্ডবিধি চালু করা।

[লেখক : কলামিস্ট]

দৈনিক সংবাদ : ৬ এপ্রিল ২০১৯, শনিবার, ৭ এর পাতায় প্রকাশিত

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও শেখ হাসিনা

১১ জুন বাঙালি জাতির জীবনে একটি রেড লেটার ডে। আজ থেকে ১১ বছর আগে ২০০৮ সালের এই দিনে (১১ জুন) সেনাসমর্থিত

জিয়া-মঞ্জুর হত্যা এবং এরশাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’ অর্থাৎ একেবারে না হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হওয়াটা ভালো। বিলম্বে হলেও বিচার

চিনি শিল্পে সংকট ও উত্তরণ

সময় মতো আখ বিক্রির টাকা না পেয়ে ক্ষোভে-দুঃখে জমি থেকে আখ উপড়ে ফেলেছেন জয়পুরহাট চিনি কলের কৃষক। আখের বদলে আবাদ

sangbad ad

চুকনগর গণহত্যা দিবস : গণহত্যার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে চুকনগরের মাটি

image

২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তখনও ঢাকাসহ কয়েকটি

জাহানারা ইমাম নিরলস যুদ্ধ করেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে

দিল মনোয়ারা মনু

image

আমাদের দেশে যখন মুক্তিযোদ্ধারা সূর্যরশ্মির মতো ছড়িয়ে পড়েন সবখানে, মুক্তিযুদ্ধে যখন হয়ে ওঠেন এক অবিনশ্বর আকাশ, যেখানে

জঙ্গিদের পরবর্তী লক্ষ্য কোন দেশ!

রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশকিছু ওলোট-পালটের ঘটনা ঘটছে। শিগগিরই আরও কিছু ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। মারাত্মকভাবে হতাশায় নিমজ্জিত দলগুলোতেই

এক বাগানের ফুল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জাপান নতুন যুগে পদার্পণ করতে চলেছে। আড়ম্বরের সঙ্গে আয়োজন করা হচ্ছে- জাপানের ভাবী সম্রাট নারুহিতো

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস জাতিরাষ্ট্রের মাপকাঠিতে আটকে রাখা যায় না

image

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মন মাতানো গান ‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই...’ নানা জনের মুখে মুখে ফেরে। ‘বাংলা’

বোরো ধানের ব্লাস্ট রোগ : কারণ ও প্রতিকার

ব্লাস্ট ধানের একটি ছত্রাকজনিত মারাত্মক ক্ষতিকারক রোগ। পাইরিকুলারিয়া ওরাইজি (Pyriculria Orayzai) নামক

sangbad ad