• banlag
  • newspaper
  • epaper

ঢাকা , মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯

 

ওহ নদী রে... আহা নদী রে...

আবু আফজাল মোহা. সালেহ

নিউজ আপলোড : ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০১৯

চীনে একটা প্রবাদ আছে এরকম- ‘নদীকে না দেখলে, নদীও তোমায় দেখবে না। আর, নদী দেখা বন্ধ করলেই... সব শেষ! নদী হচ্ছে সভ্যতার ভরকেন্দ্র। নদীকে কেন্দ্র করেই শহর গড়ে উঠেছে। সভ্যতাগুলো গড়ে ওঠার পেছনে কিন্তু নদীর অবদান বেশি। যেমন মিসরকে নীল নদের দান বলা হয়। ও নদী রে... এখন বলতে হচ্ছে আহা নদী রে! দূষণ আর দখলে বাংলাদেশের প্রায় সব নদী। বিশেষ করে রাজধানী বা বড় শহরগুলোর নদীগুলোর অবস্থা শোচনীয়। আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের ভয়ে সাক্ষ্য দেয় না কেউ। বলা যায়, জনগণের সহায়তা নেই। এ কারণে রূপসা থেকে সুরমা, নাফ-হালদা-পুনর্ভবা, করতোয়া থেকে তিতাস-কর্ণফুলী সবই দূষণ আর দখলের শিকার। আর রাজধানীকেন্দ্রিক নদীগুলো তো এক একটা বিষফোঁড়া হয়ে গেছে। বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা-তুরাগের পানি বিষাক্ত, লালচে কালো হয়ে গেছে। অথচ নদীগুলোকে সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতকে বিকশিত করতে পারত। এখনও ব্যবস্থা নিলে পর্যটন খাতকে বিকশিত করার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রেহাই দেবে। এজন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সময়োপযোগী আইন-বিধিমালা প্রণয়ন করে এবং ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করে আমরা এগিয়ে যেতে পারি।

সুষ্ঠু পরিকল্পনা করলে বা নদীখেকোদের হাত থেকে নদী রক্ষা করে বা শিল্পকারখানা থেকে বর্জ্যরে মাধ্যমে পানি দূষণ থেকে রক্ষা করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হবে। জলপথে পরিবহন তুলনামূলক খরচ অনেক কম। নদীগুলো খনন করে পানির ধারা বজায় রেখে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারি। এতে সড়কপথের চাপ কমবে, অপচয় কম হবে। এবং যানজট কমে যাবে। ব্যাপক কর্মসংস্থান গড়ে উঠবে। নদীকেন্দ্রিক অনেক মৃতপ্রায় শহর জেগে উঠবে আর অনেক নতুন শহর গড়ে উঠবে। পানি পানি চারিদিকে অনেক পানি। কিন্তু পান করার মতো পানি নেই।

বিবিসির এক সমীক্ষায় দেখা যে, বাংলাদেশের ৪৩৫টি নদী এখন হুমকির মধ্যে। এর মধ্য ৫০-৮০টি নদী বিপন্ন। এখন এ সংখ্যা অনেক বেশি। তবে আশার কথা, সরকার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। জাতীয় নদী কমিশনের এক জেলা সভায় চেয়ারম্যান/সদস্য মারফত এ তথ্য জেনেছি। সরকার কিছু কাজও শুরু করেছে। আদালত থেকে দূষণ ও নদীর ব্যাপারের নির্দেশনাও রয়েছে। এখন আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কয়েকটি নদীর পরিবেশগত অবস্থান নিয়ে আমি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।

২০০৯ সালে হাইকোর্টের রায়ে বুড়িগঙ্গা,তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীর অপমৃত্যু রোধ করে ঢাকা মহানগরকে রক্ষার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। নদীর মধ্যে অবৈধ স্থাপনা অপসারণের পাশাপাশি জরিপ কাজের পর সীমানা নির্ধারণ করে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করার নির্দেশও ছিল। কিন্তু সবক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত/কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী এখন যথেষ্ট সজাগ। তিনি প্রকাশ্যে এর ব্যাপারে ইতিবাচক বক্তব্যও দিচ্ছেন। এবার আমরা আশাবাদী। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পালা।

দেশের প্রধান চারটি নদী- পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র পলি জমে ভরাট হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে ঘোলা পানির চেয়ে সাদা বালির চাকচিক্যই বেশি চোখে পড়ে! শুধু বাংলাদেশেই সহস্রাধিক নদীর সমন্বয়ে গঠিত বিশাল এক নদীব্যব¯হা রয়েছে। আর কোনো দেশে তা অকল্পনীয়। সরকার বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে একের পর এক নদী হারিয়ে যাচ্ছে। মূলত অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে এ দেশের অনেক নদী হারিয়ে গেছে। ফলে বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রাও। ১৯৭৫ সালে এ দেশে নৌপথ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার, এখন তা মাত্র ছয় হাজার কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। শুকনো মৌসুমে এই পথ আরও কমে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারে এসে থামে। দূষণ আর ভরাটের কারণে বদলে যাচ্ছে নদীর চেহারা। অবৈধ দখল আর অপরিকল্পিত নদীশাসনের ফলে ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে নদী, হারাচ্ছে নাব্য। অপরিকল্পিত ড্রেজিং বা একেবারেই ড্রেজিং না করা, আর ইচ্ছেমতো যেখানে-সেখানে বাঁধ নির্মাণের কারণে নদী মৃত্যুর মুখে পড়ছে। কপোতাক্ষ, ইছামতী, ভৈরব, মুক্তেশ্বরী, বেতনা, নরসুন্দা, ফুলেশ্বরী, ধনু, রূপসা, ডাকি, শিবসাসহ আরও কত নদ-নদী পরিণত হয়েছে সরু খালে! এমনকি অপরিকল্পিত রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণের কারণেও নদী ভরাট হয়। মূলত দীর্ঘ সময় অবহেলা করার কারণেই এ দেশে নদী মৃত্যুর হার বাড়ছে। কোনো-কোনোটির আবস্থা এত খারাপ যে, চেষ্টা করেও নাব্য ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না।

নদী এ দেশে জালের মতো ছড়ানো, এ নদীকে কেন্দ্র করেই মানুষের জীবনযাপন ও যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা, প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁসহ সব শহর-নগর। যাতায়াত মানেই ছিল নদীপথে যাতায়াত। সওদাগরী নৌকা পাল তুলে ছুটে যেত দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এখন নদীপথে পণ্য যাতায়াত কমে গেছে। নাব্যতার কারণে এ দুরবস্থা। কিন্তু জলপথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারলে রাজধানীসহ বেশ কিছু শহরের যানজট কমে যেত। এতে সময় ও অর্থের অপচয় কমে যেত। বাংলাদেশে এখনও শিল্পকারখানা স্থাপনেও গুরুত্ব দেয়া হয় নদীপথের যোগাযোগকে। মালামাল পরিবহণে নদীকে ব্যবহার করা গেলে খরচ কম পড়ে। শীতলক্ষ্যার তীরে একটি বহুতল ভবন। কিন্তু উৎকট গন্ধে বসবাস কষ্টকর। শীতলক্ষ্যা নদীর কালো রঙের জল থেকে নাকে এসে ধাক্কা দেয় উৎকট গন্ধ। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে অল্প দূরত্বের শহর নারায়ণগঞ্জ। দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বন্দর থাকায় শহরটির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত শীতলক্ষ্যা নদী বহুদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। এটা পরিবহন কাজে ব্যবহার করলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারতাম।

বিভিন্ন নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় গত কয়েক দশকে নদীপথে যাতায়াত কমলেও এরই মধ্যে এর গুরুত্ব বুঝেছে সরকারও। এ কারণে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নেয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ হিসাবে ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ। বিগত কয়েক বছর ধরে সরকার বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে নদীভিত্তিক পর্যটনও পেয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাতটি উপজেলার বুক চিরে প্রবাহিত তিতাস নদীতে এখন চোখে পড়বে হাজার হাজার মৎস্য ঘের। অবৈধ দখলদারেরা বাঁশ পুঁতে আর জাল দিয়ে ঘিরে আটকে ফেলেছে নদীর জল। আর তার মধ্যে নদীর মাছ আটকে সেগুলো শিকার করছে তারা। এসব ঘেরে সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার কোন অধিকার নেই। হাজার হাজার ঘেরের ফলে নদীর মাছের চলাচল বিঘ্নিত হয়ে যেমন হুমকির মুখে পড়েছে প্রাণীবৈচিত্র্য, তেমনি পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নদীতে পলি জমে দিনকে দিন কমছে নাব্যতা। শুধু তিতাসেই নয়, বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদীরই এরকম অবস্থা। এগুলো থেকে অবশ্যই পরিত্রাণ পেতে হবে।

বরিশাল-খুলনা বিভাগের (কিছু অংশ) নদী নির্ভর ছিল। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হত নদীকেন্দ্রিক। এক সময় বাংলাদেশের শস্যভান্ডার ছিল দক্ষিণাঞ্চল। বিশেষ করে বরিশাল অঞ্চল। এক সময় বরিশালকে বলা হতোÑ ‘ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল’। প্রবাদটি প্রচলিত ছিল দেশজুড়েই। কিন্তু এখন আর সে অবস্থা নেই। দখল হয়েছে, পানিশূন্য হয়েছে অনেক নদী। চিংড়ির ঘের করা হচ্ছে এসব এলাকায়। ড্রেজিং ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের একটি হিসাব বলছে, দেশের মোট ধানের ১০ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন হয় কেবল ময়মনসিংহে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে রংপুর। শুধু রংপুরই নয়। উত্তরবঙ্গের সবুজ বিপ্লবের পেছনে রয়েছে তিস্তা প্রক। কিন্তু তিস্তা বেশিরভাগ সময়ই প্রায় পানিশূন্য থাকে। বর্ষাকালে একটু বৃষ্টি হলেই বন্যা আশঙ্কা জাগে। ধু-ধু বালুচরে বাদাম আর ভুট্টার চাষ হচ্ছে এখন।

খুলনা বিভাগের অন্যতম ও সৌন্দর্যের নদী বলা হয় চিত্রা। নড়াইল শহরের পাশ ঘেঁষে চিত্রা নদীর প্রবাহ। ছবির মতোই সুন্দর। এ নদীই চিত্রশিল্পী সুলতানকে বিকশিত করতে সহয়তা করেছিল। আজ নদীটি সংকাটাপন্ন। নড়াইল শহরের পাশে অনেকই নদীর সীমানা দখল করে নানা ধরনের স্থাপনা গড়ে তুলেছে। নদীটির উৎপত্তি চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলায়। প্রায় ১৩০ কিমি. দৈর্ঘ্যরে এ নদী চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ-মাগুরা হয়ে নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় নবগঙ্গা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। আজ শীর্ণকায় মরাখাল হয়ে গেছে। মাথাভাঙ্গা, কপোতাক্ষ বা ভৈরবসহ এ এলাকার অনেক নদীর অবস্থাও শোচনীয়।

তুরাগ নদের দুই পাড়ে দীর্ঘ এলাকাজুড়ে একদিকে যেমন ঘনবসতি গড়ে উঠেছে অন্যদিকে শিল্প-কারখানাও হয়েছে সমানতালে। তুরাগ নদ বিভিন্ন জায়গায় এখন ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গত কয়েকবছরে তুরাগে তীরের বিভিন্ন জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করা হলেও দূষণের মাত্রা কমেনি বলে জানাচ্ছেন পরিবেশবাদীরা।

প্রাকৃতিক নিয়মে নদীর ভাঙনে প্রতিবছর ঘরবাড়ি হারায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। ভাঙনপ্রবণ এই নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম ধরলা। তবে প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে ধরলা নদীর ভাঙ্গনের কারণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে মানুষের কর্মকান্ড। মানুষের লোভ যে কীভাবে একটি নদীকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ ধরলা নদী। বছরের পর বছর অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করার ফলে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে এই নদীর গতিপথ, আর ভাঙনের ফলে ঘরবাড়ি হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক নদীটি বাংলাদেশে ঢুকেছে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা দিয়ে এবং আবার ভারতে প্রবেশ করে ফিরে এসেছে কুড়িগ্রাম দিয়ে। নদীটির বাংলাদেশ অংশে ৭৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বেশিরভাগ অংশই বয়ে গেছে পাটগ্রামের ওপর দিয়ে। কুড়িগ্রামে প্রাকৃতিক নিয়মে ধরলা নদীতে ভাঙা-গড়ার খেলা চললেও পাটগ্রামে নদীটির চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বছরের পর বছর অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে সেখানে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম ভাঙন। ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে নিয়মিত চলছে পাথর উত্তোলন। এর ফলে গতিপথ হারাচ্ছে, নদী দূষণ হচ্ছে, ভাঙাপাথর বায়ু দূষণ করছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতিপথ ধরে রাখতে না পারায় এসব স্থানের মতো গাইবান্ধা-লালমনিরহাটেও নদী ভাঙনে বিপর্যস্ত মানুষ। এবং অর্থনৈতিক বিপদাপন্ন হচ্ছেন অনেকে। বাস্তুহারা হচ্ছে হাজার হাজার লোকজন ও পশুপ্রাণী।

ঢাকা ঘিরে থাকা চার নদী শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু ও বুড়িগঙ্গা প্রায় একই দশায় পড়েছে। এগুলোতে পানির চেয়ে বর্জ্যই বেশি। মাত্রাতিরিক্ত দূষণে এ নদীগুলোর পানি ও রং হারিয়ে ফেলেছে। বর্জ্যরে মিশ্রণে নদীগুলোর পানি কালো, নীল বা লাল হয়ে গেছে। এ চার নদীকে সরকার ‘প্রতিবেশ সংকটাপন্ন’ ঘোষণা করেছে। আর বিশ্বব্যাংক বুড়িগঙ্গাকে অভিহিত করেছে ‘মরা নদী’ নামে। চামড়া শিল্পের বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষিত করে চলেছে প্রতিনিয়ত। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলো এতটাই দূষিত যে, এসব নদীর পানি এখন শোধনেরও অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নদীগুলোতে এক সময় প্রচুর মাছ ছিল। অথচ এখন শুধু মাছ নয়, কোনো জলজ প্রাণীই টিকে থাকতে পারছে না। বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঢাকা শহরের পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকার কারণে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ঘনমিটারেরও বেশি পয়ঃবর্জ্যরে প্রায় সবটাই উন্মুক্ত খাল, নদী, নর্দমা বেয়ে অপরিশোধিত অবস্থায় বুড়িগঙ্গায় এসে পড়ছে। টঙ্গী, বাড্ডা প্রভৃতি অঞ্চলের বর্জ্য চলে যাচ্ছে বালু ও তুরাগে। বর্জ্য শোধণাগার নির্মাণ করতে হবে আরও। শুধু সায়েদাবাদেরটাতে কাজ হবে না।

নওগাঁয় রয়েছে ছোট বড় ৬টি নদী। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে আত্রাই, ছোট যমুনা, তুলসী গংগা, নাগর, শিব, ফকিন্নি, পুনর্ভবা নামক এসব নদী শুকিয়ে পানি শূন্য হয়ে গেছে। এক সময় এসব নদী ছিল হাজার হাজার মানুষের জীবিকার উৎস। এখন বছরে মাত্র তিন থেকে চার মাস পানি থাকে এসব নদীতে এরপর ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়। পানি শূন্য মরা নদীতে চলছে দখল ও দূষণের প্রতিযোগিতা। বগুড়ায় দীর্ঘদিন সংস্কার, খননের অভাব ও ভূমিদস্যুদের কালো থাবায় এককালের খরস্রোতা করতোয়া নদী আজ পচা নর্দমায় পরিণত হয়েছে। বগুড়া জেলায় যমুনা, বাঙালি, করতোয়া প্রধান নদী। ইছামতিসহ বেশ শাখা ও উপশাখা নদী রয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে যমুনা নদী ৪০ বছর আগে সারিয়াকান্দি শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার পূর্বে ময়মনসিংহ জেলার পশ্চিম সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হতো। বর্তমানে সারিয়াকান্দি উপজেলা শহরেই যমুনা নদী। আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও করতোয়াসহ অনেক নদীতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।

হালদায় দূষণের মাত্রা বাড়ছেই। এখনই ব্যবস্থা নেয়া না গেলে হালদার পরিণতি বুড়িগঙ্গার মতো হবে বলে বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই মতামত দেন। শিল্পকারখানা আর আবাসিকের বর্জ্য হালদার মতো কর্ণফুলী নদীকেও দূষিত করছে।

বিআইডব্লিউটিএর মতে- ১৯৭১ সালে এ দেশে নদী ছিল, ২৪ হাজার কিমি. দীর্ঘ যা ১৯৮৪ সালে কমে গিয়ে দাঁড়ায়, ৮৪০০ কিমি.। আর বর্তমানে আমরা হারিয়েছি ১৮ হাজার কিমি. দীর্ঘ নদী পথ এবং অবশিষ্ট আছে মাত্র ৬ হাজার কিমি.। গবেষকগণেরা মত প্রকাশ করেছেন এ অবস্থা চলমান থাকলে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ নদীমাতৃক বাংলদেশ ইতিহাসের বইতে থাকবে। বাস্তবে থাকবে না।

ভারতের যমুনাতেও দূষণের মাত্রা অনেক। এখানেও কার্যত কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি। একমাত্র আশার দীপ জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনাল। এর প্রধান বিচারপতি স্বতন্ত্র কুমার হুঁশিয়ারি জারি করেছেন, কোনো সংস্থা যদি যমুনায় রাবিশ ফেলে তাহলে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এরকম ব্যবস্থা বাংলাদেশও গ্রহণ করতে পারে। যমুনা রাজধানী, রাজস্থান ও হরিয়ানার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত।

বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী সুরমা। ৩৯৯ কিলোমিটার লম্বা। সুনানগঞ্জ আর সিলেটে দখল ও দূষণ ঘটছে এ নদীটির। পাহাড়ি নদীতে এঙ্ক্যাভেটর মেশিনে অপরিকল্পিতভাবে যথেচ্ছা পাথর উত্তোলনের কারণে জাফলংয়ের পিয়াইন, ডাউকি এবং ভোলাগঞ্জের ধলাই নদী, তামাক চাষের কারণে চকোরিয়ার মাতামুহুরী নদী, ভারতের মেঘালয়ে কালাপাহাড় কেটে কয়লা উত্তোলনের কারণে কয়লার ময়লা ও নুড়ি-পাথরের মিশ্রিত পানির ঢলের কারণে সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদী বিপর্যয়ের মধ্যে। বোল্ডার নিক্ষেপের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদী, বিল-হাওর-বাঁওড় বিপর্যস্ত। এগুলোতে যথাযথ তদারকি বাড়াতে হবে।

ঢাকার চারপাশের চারটি নদী বাঁচাতে ২০০৯ সালের ২৫ জুন হাইকোর্ট ১২ দফা নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে ছিল নদীর সীমানা নির্ধারণ করে সীমানায় পাকা খুঁটি বসানো, তীরে হাঁটার পথ নির্মাণ ও বনায়ন করা, খনন করা, তীরের জমি জরিপ করা, যমুনার সঙ্গে ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের পানিপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য নিয়মিত খননকাজ পরিচালনা করা প্রভৃতি নির্দেশনা দেয়া হয়। এগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। আজ নদী দখল হচ্ছে, কাল হাইকোর্ট থেকে একটি আদেশ দেয়া হচ্ছে। এর কয়েক দিন নিরিবিলি থাকার পর আবার দখল-দূষণ শুরু হয়ে যায়। এ কানামাছি খেলাটা বন্ধ হওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার চার নদীর দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠান ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) ছাড়াই পরিচালনা চালাচ্ছে। ফলে তার দূষিত তরল বর্জ্য সরাসরি পড়ছে নদীতে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বারবার অভিযান চালিয়েও দূষণ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অভিযান চালিয়ে নদীদূষণের জন্য দায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানাও করা হচ্ছে। পরিবেশ আইনে মামলা করা হলেও ওই সব মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির নেই। আর এ কারণেই শুধু জরিমানা দিয়ে তারা আবার শুরু করছে দূষণের কাজ।

পাবনার ঐহিত্যবাহী নদী ইছামতি। শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই নদীর বুকফাটা কান্না শোনে না কেউ। প্রায় ২০ বছর ধরে পাবনার ইছামতি নদী খনন করা হবে, সচল করা হবে এ ধরণের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে কিছুই হয়নি। দীর্ঘদিনে নদী শুকিয়ে গেছে। পরিণত হয়েছে ময়লা আবর্জনা ফেলার ভাগাড়ে। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, মশা উৎপাদনের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে।

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের শহরগুলোয় পরিবেশ দূষণের কারণে বছরে ৬৫০ কোটি ডলারের (৫৪ হাজার কোটি টাকা) ক্ষতি হয়, যা ২০১৫ সালের জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। শহরের পরিবেশ দূষণজনিত কারণে বছরে ৮০ হাজার লোকের মৃত্যু হয়, যা মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশ। অনেকের অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর কয়েক গুণ বেশি। Enhancing opportunity for clean & Resilient Growth in Urban Bangladesh প্রতিবেদনে শহরগুলোয় মানুষের জীবনমানের ক্ষতির কথাই শুধু বলা হয়েছে। দেখা গেছে, ঢাকা নগরীর নদ-নদীগুলোর দূষণের কারণে ঢাকাসহ এর আশপাশের কয়েকটি জেলায় আমরা বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি মাছ থেকে বঞ্চিত হই।

শিল্প, গৃহস্থালি, পয়ঃবর্জ্যে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর দূষণ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। নদী রক্ষায় পরিকল্পনা, প্রতিবেদনের কমতি নেই। অভাব শুধু দূষণকারীর শাস্তি নিশ্চিত করা, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণের। আইনের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে। ঢাকায় প্রতিদিন চার হাজার ২০০ টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। সিটি করপোরেশন এর মধ্যে মাত্র ৪৫ শতাংশ সংগ্রহ করে। বাকিটা উন্মুক্ত জায়গায়, নিন্মাঞ্চলে পড়ে থাকে। শেষ গন্তব্য নদী। বর্জ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্ট কনসার্নের হিসাবে, ১০ বছর পর এ বর্জ্যরে পরিমাণ হবে সাড়ে আট হাজার টন। প্রায় অনুচ্চারিত থাকা আরেকটি দূষণের এলাকা হলো ঢাকা সদরঘাট। সদরঘাটের দায়িত্বে থাকা অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্র হতে জানা যায়, সেখান থেকে প্রতিদিন ৪০ হাজার মানুষ চলাচল করে। সেসব মানুষের বর্জ্য, নৌযান ধোয়ার পর তেলসহ নানা বর্জ্য পড়ে নদীর পানিতে।

নদী বাঁচালে বেশ কয়েকটা সম্ভাবনাময় সেক্টর জেগে উঠবে। যোগাযোগ, পর্যটন, কৃষি, মৎস্য তো সরাসরি উপকৃত হবে। আর পরোক্ষভাবে অনেক সেক্টরের অক্সিজেন সরবরাহ হবে। জেলেসহ কয়েকটি সম্প্রদায়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আর দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদি ক্ষুদ্র/মাঝারি কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে।

[লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ]

দৈনিক সংবাদ : ৫ মার্চ ২০১৯, মঙ্গলবার, ৭ এর পাতায় প্রকাশিত

চুকনগর গণহত্যা দিবস : গণহত্যার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে চুকনগরের মাটি

image

২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তখনও ঢাকাসহ কয়েকটি

জাহানারা ইমাম নিরলস যুদ্ধ করেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে

দিল মনোয়ারা মনু

image

আমাদের দেশে যখন মুক্তিযোদ্ধারা সূর্যরশ্মির মতো ছড়িয়ে পড়েন সবখানে, মুক্তিযুদ্ধে যখন হয়ে ওঠেন এক অবিনশ্বর আকাশ, যেখানে

জঙ্গিদের পরবর্তী লক্ষ্য কোন দেশ!

রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশকিছু ওলোট-পালটের ঘটনা ঘটছে। শিগগিরই আরও কিছু ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। মারাত্মকভাবে হতাশায় নিমজ্জিত দলগুলোতেই

sangbad ad

এক বাগানের ফুল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জাপান নতুন যুগে পদার্পণ করতে চলেছে। আড়ম্বরের সঙ্গে আয়োজন করা হচ্ছে- জাপানের ভাবী সম্রাট নারুহিতো

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস জাতিরাষ্ট্রের মাপকাঠিতে আটকে রাখা যায় না

image

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মন মাতানো গান ‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই...’ নানা জনের মুখে মুখে ফেরে। ‘বাংলা’

বোরো ধানের ব্লাস্ট রোগ : কারণ ও প্রতিকার

ব্লাস্ট ধানের একটি ছত্রাকজনিত মারাত্মক ক্ষতিকারক রোগ। পাইরিকুলারিয়া ওরাইজি (Pyriculria Orayzai) নামক

শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই গড়ে তুলব বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা

বাঙালির অবিসংবাদিক নেতা ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে।

মুজিবনগর সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্ব

image

১৭ এপ্রিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। ১৯৭১-এর এ দিনে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের আম্রকাননে একাত্তরে যুদ্ধ পরিচালনাকারী

মাদক আসছেই

জাতীয় দৈনিক পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও ঝিনাইদহের মহেশপুর ও চুয়াডাঙ্গার জীবননগর

sangbad ad