• banlag
  • newspaper
  • epaper

ঢাকা , সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০

 

শালুক ও অধুনাবাদ : প্রকৃতিমুগ্ধ, প্রথাহীনতার নির্ভার অসীমতা

ওবায়েদ আকাশ

নিউজ আপলোড : ঢাকা , সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২০

image

কবি ও দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সম্পাদক ওবায়েদ আকাশ (সম্পাদক-শালুক)। আলোকচিত্র : কবি ভাগ্যধন বড়ুয়া

[‘শালুক’ প্রবর্তিত সতন্ত্র চিন্তা পদ্ধতি ‘অধুনাবাদ’ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এটিই প্রথম রচনা]

বিবিধ প্রজাতিতে নিরন্তর অনুসন্ধান পর্যবেক্ষণ ভাংচুর সংস্কার অনুশীলন অধ্যবসায় এক অনিবার্য প্রক্রিয়া। যে কোনো সৃষ্টির মূলে এর প্রতিটি পর্যায় মৌলিক ও অনিবার্য উপাদেয় হয়ে কাজ করে। সৃষ্টি ফিরে পায় পরিপূর্ণতা। স্রষ্টা খুঁজে পায় সার্থকতা। এই সার্থক হবার প্রাক্কালে দেখি, বাবুই পাখিটি তার বাসাটি নির্মাণের কালে সামান্য ব্যত্যয় ঘটলেই তাকে পুনর্নির্মাণে প্রয়াসী হয়। চড়ুই পাখিটা তার আশ্রয় নির্মাণে খুঁজে নেয় ঘরের কার্নিশের নিভৃত কোণ। এক একটি এলাকা নির্ধারণ করে বাঘ, সিংহ কিংবা প্রকাণ্ড হিংস্র প্রাণিরা নিজেদের কর্তৃত্ব আবিষ্কার করে। দুর্বলকে ঘায়েল করে খায়। প্রতিপক্ষের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করে। মানুষ নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাববার পরদিন থেকেই শুরু করেছে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম। বাধ্য হয়েছে অন্যান্য প্রাণির হাত থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে। শিখেছে খাদ্য গ্রহণের কৌশল, খাদ্যান্বেষণের কারিকুরি। মানুষ পাতার পোশাক থেকে আজ সমকালীন ফ্যাশন কিংবা সর্বসাম্প্রতিক স্টাইল সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছে। গুহা কিংবা বৃক্ষতল থেকে বাস করতে শিখেছে সুন্দরতম অট্টালিকায়। এখানেও বসে সেই মানুষ। সম্পৃক্ত হয়েছে অগণ্য সৃষ্টিশীল কাজে। অভাবিত তার সৃষ্টি সাম্রাজ্য। সময়ানুগ চেতনা তাকে প্রতিনিয়ত প্ররোচিত করছে। তাতে উথলে উঠছে মানুষের সৃষ্টিসত্তা। সৃষ্টি মানেই নির্মাণ। নির্মাণ মানেই অস্তিত্ববাদী অবস্থানের প্রবল উপস্থিতি। সৃষ্টি দিয়ে নির্মাণ করছে বিশেষ বিশেষ অস্তিত্ব। ঘোষণা করছে স্বনির্মিত অস্তিত্বের বহুমাত্রিক অবস্থান।

এই সব সৃষ্টিশীলতা মানুষকে নিরন্তর নতুন নতুন সৃষ্টিতে প্রলুব্ধ করছে। এক সৃষ্টিতে সন্তুষ্ট নয় মানুষ। সন্তুষ্ট নয় সদ্য সমাপ্ত উদ্ভাবনে। তাই নিরন্তর উদ্ভবনপ্রয়াসী স্রষ্টা। স্রষ্টাকে থেমে থাকতে নেই। তবে স্তব্ধ হয়ে যাবে চিন্তার প্রবাহধারা। এই অব্যাহত খনন প্রক্রিয়ায় সে সাজানো পৃথিবীকে রেখেছে গতিশীল। এক স্রষ্টা চালিত করছে অপর স্রষ্টাকে। এ যেন নির্দিষ্ট দূরত্বে সারিবদ্ধ ইট সাজিয়ে প্রান্তিক ইটে একটি ধাক্কা দিলে সব ইটে পরপর ধাক্কা লাগার মতো অবস্থা।

এই সৃষ্টিশীলতার ভিতর দিয়ে অগ্রসর হয় সভ্যতা। সভ্যতার প্রয়োজনে প্রয়োজন পড়ে চেতনার নিরন্তর জেগে থাকবার অনিবার্যতা। কিন্তু চিন্তার অসাড়তা বলেও কালে কালে একটি ক্রিয়াশীল স্থবিরতাকে সকল ছাপিয়ে বড় হতে দেখি। কখনো তা মহীরূহ হয়ে পড়ে। মানুষের চিন্তায় ভর করে, ভাবনার দৈন্য, মৌলবাদ, কুসংস্কার, স্বেচ্ছাচার, ব্যক্তিপূজার মতো নিকৃষ্টতা। দীর্ঘদিনের এই বিকল চিন্তার ফসল একদিন আমরা ঘরে তুলে নাক ডেকে ঘুমাই। আর গভীর রাতে সিঁধ কেটে চুরি হয়ে যায় আমাদের যা কিছু মহার্ঘ অর্জন।

শালুক মানুষের ভাবনার স্বাধীনতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে যা অর্জিত হয়েছে, তা আজ দৃশ্যমান বাস্তবতা। অসংখ্য লেখক তাদের চিন্তার বিকাশমান ধারার চর্চায় শালুককে পাশে পেয়েছে। টিলা থেকে চূড়ায় উঠেছে তাদের সৃজনশীলতার সংক্রমণ। সকল প্রকার সুসংকলনের অধিত ব্যাখ্যায় এ কথা বলাই যায়, শালুক সর্বদা এক সৃষ্টিবান্ধব লিটল ম্যাগাজিন। নিরন্তর নিরীক্ষাপ্রয়াসী তার লেখকগোষ্ঠী। অব্যাহত সৃজনশীলতা ও ভাংচুর দিয়ে চিন্তার ব্যাপকত্বে ছড়িয়ে দিয়েছে উল্লম্ফ ডানা।

শালুকের সম্পূর্ণ নিজস্ব চিন্তার ফসল অধুনাবাদ প্রধানত এই সৃজনশীলতা ও নিরীক্ষাপ্রবণতার প্রবাহমানতাকে বিরামহীন ক্রিয়াশীল রেখে নতুন অন্বয়ের খোঁজে সদা তৎপর।

সংশ্লিষ্ট মেধাবী তরুণকে প্রধান টার্গেটে রেখে অধুনাবাদ তার মৌলিকত্বে আস্থা রাখতে চায়। সে চায় ওই মেধাবী তরুণের আহৃত জ্ঞানের চেয়ে যতটুকু তিনি বয়ে এনেছেন তার পোস্টমর্টেম। জন্মগত জিজ্ঞাসায় প্রাপ্ত মেধার যে স্ফুরণ- তার বিকাশধারাকে পর্যবেক্ষণ করবে অধুনাবাদ। এবং তার সঙ্গে সমন্বিত আহৃত জ্ঞানের পরিণতিতে প্রাপ্ত সমত্তীর্ণ সৃজনশীলতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তাদের মেধাবী ডানায় পাল তুলে দেবে অধুনাবাদ। কালিক চেতনায় এ পর্যবেক্ষণ নিঃসন্দেহে মৌলিক।

কেবলই সৃজনশীলতা যেখানে সদাতৎপর, কেবলই নিরীক্ষা যেখানে মুখ্য, কেবলই প্রবাহমানতা যেখানে অনিবার্য, কেবলই নবঅন্বয়ের ধারণা যেখানে সংবদ্ধ- সেখানেই অধুনাবাদের দুর্বিনীত চলা।

এই সৌরম-লীর সৃষ্টি রহস্যেই লুকিয়ে আছে যে কোনো নতুন নতুন সৃষ্টির প্রসব বেদনা। তারপর ধীরে ধীরে তার ব্যাপ্তিতে ছড়িয়ে দেয়া সমগ্র সৃষ্টি। সৃষ্টি বলতেই যে উদ্ভাবন। তার প্রথম উদ্ভাবন ছিল প্রাণিজগতের খাদ্যের অন্বেষায়, তারপর আশ্রয়, এবং তারপর সভ্যতায়। গুহাবাসী মানুষ কেন প্রথম শিল্প করেছিল? কে তাকে পৌঁছে দিয়েছিল শিল্প সৃষ্টির ধারণা? কোথা থেকে পেল তারা লজ্জা নিবারণের আগে নন্দন ভাবনা? তাই অধিক করে ভাবতে চেয়েছে শালুক। তাই হয়ে উঠেছে অধুনাবাদী চিন্তার মৌলিক জিজ্ঞাসা। সহজাতভাবে এই চিন্তা ছিল গুহাবাসীর বিস্ময় আবিষ্কার। সৃষ্টির ধারণা লাভের চেয়ে বরং দীর্ঘ দীর্ঘ কাল এই ধারণা বিতরণ করেছে মানবকুলে। তারপর সভ্য মানুষের বিবেক কিংবা নির্বিবেক জাগ্রত হয়েছে, তারা তুলি দিয়ে এঁকেছে যেমন নন্দন, তারা আর হাতে অস্ত্র তৈরি করে হরণ করেছে মানুষের প্রাণ। এই যদি হবে, শিল্পের সাম্প্রতিকায়নের পাশাপাশি হত্যার নন্দন কেন প্রয়োজন পড়েছিল? বৃহৎ জঙ্গলে পশুদের বাস। তাদের কেন বর্ডারের প্রয়োজন পড়ে না? চীনের প্রাচীর কিংবা কাঁটাতারের বেড়া তো নেই অরণ্য গহনে। তবু কেন তারা নির্ভার মানুষের চেয়ে? মানুষে মানুষে যত রক্তপাত, পশুতে পশুতে কেন ততটা নয়? এই জিজ্ঞাসা অধুনাবাদের।

একুশ শতকে দাঁড়িয়ে কেন একটি তত্ত্বগত ধারণাকে এই বিষয়টাকে অন্যতম প্রধান স্তম্ভ করে ভাবতে হচ্ছে? সেভাবনা থেকে নিস্তার কোথায়? যে হাতের প্রধান অস্ত্র মসি, সেই হাতকেই কী করে অলঙ্কৃত করছে পারমানবিক বোমা? যে হাত শিল্প করছে, যে হাত নন্দন লিখছে, সেই হাতকেই কী করে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রতারণায়, অপকৌশলে, দুর্নীতিতে? শালুক সে প্রশ্নের মুখোমুখি অধুনাবাদের চর্যায়।

ভাবি মনে মনে, নদীর স্তব্ধতার চেয়ে ভয়াবহ কিছু নেই।

অধুনাবাদ শুধু হাজামজায় ভরে যাওয়া নদী খনন করেই তৃপ্ত নয়। সে ফিরে পেতে চায় হারানো প্রবাহধারা। অধুনাবাদ নিরন্তর গতিতে বিশ্বাসী, স্তব্ধতায় নয়। তাই তার কাছে প্রাধান্য পেয়েছে সৃজনশীলতার গতি। এই সৃজনশীলতার বিরাট ও প্রধানতম অধ্যায় জুড়ে রয়েছে কবিতা, সঙ্গীত, চিত্রকলা, কথাসাহিত্য, নাট্যকলা, চলচ্চিত্র, বুদ্ধিবৃত্তি, সমাজ ও রাজনীতি।

এর প্রতিটি অধ্যায়ে স্বতঃস্ফূর্ততা আনয়নে, এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রের মৌলিকত্ব ও নতুনত্বকে পর্যবেক্ষণে ও নিরীক্ষায় অধুনাবাদ তার যাত্রা শুরু করেছে। অধুনাবাদের এই যাত্রা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, প্রাচীর ভাঙা, বর্ণহীন, প্রথাহীন এক চিরউন্মুক্ত অভিজ্ঞায়। তাই এই ধারণার জন্ম হলো কোনো অবুঝ শিশুর মস্তিষ্ক থেকে। যে শিশুটি এতকাল ধরে ভাবতে ভাবতে আজ মধ্যবয়স্ক শিল্পঅন্তপ্রাণ।

কিন্তু তার ভাবনাজুড়ে শৈশব। তার ভাবনা এখন মধ্যগগনে আদি অন্তহীন। সে ভেবেছিল ভাবনার শুরুতে হয়তো প্রগাঢ় বিষয় ছিল ভাববার। তবু ডট ডট ডট (লিডার) দিয়ে হাতের মুঠোয় ফিরে পাওয়া শৈশবই তাকে অধিক নিশ্চিন্তি দিয়েছে ভাববার। বুঝতে শেখার আগে সে দেখেছে, তার শৈশব ছিল গন্ধহীন, বাতাস ছিল বর্ণহীন, বন্যা এলে ভাসিয়ে নিত সকল ধর্ম প্রজাতি, আগুন লাগলে পুড়ে যেত ধনী-নির্ধন সকলের সম্পদ, সূর্যের আলো সমানভাবে বর্ষিত হতো সকল ধর্ম বর্ণ প্রজাতিকে আলোকিত করতে। তার শৈশব দেখেছে, প্রভু আর ভৃত্যের ফসলের রং অভিন্ন, দেখেছে- সময়ান্তরে একইভাবে ক্ষুধায় জর্জর হয় প্রতিটি মানুষ। দেখেছে- সুন্দরের প্রতি ভালবাসা ধনী দরিদ্র সকলের। প্রকৃতিতে কোনো ভেদাভেদ কেন থাকে না, বিভাজন করে না ধর্ম বর্ণ ধনী নির্ধন?

কেন ফুল এক রকম গন্ধ বিলায় মালী ও প্রভুর তন্ত্রে। প্রকৃতিতে এত এত সমানানুপাত কেন? আর মানুষে মানুষে এত এত ধর্ম কেন? কেনইবা এত এত বর্ণ, এত এত বিভাজন, কেন এত এত ছোটবড় বন্ধুরতা?

যে সেই শিশুমন, কোথাও নিজেকে প্রশ্রয় দিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছে প্রকৃতির কাছে। ফিরে এসেছে বিভাজনহীনতার কাছে, ফিরে এসেছে সীমাহীনতার কাছে। শুরু হয়েছে তার কর্মচাঞ্চল্য প্রকৃতিকে ঘিরে। বর্ণগন্ধহীনতাকে উপজীব্য করে। তার আর ভাবতে বাকি থাকে না যে, প্রকৃতির চেয়ে শক্তিধর আর কিছু নেই। সে ভেবেছে, প্রকৃতির চেয়ে বড় শিক্ষক আর কিছু নেই। একটি মাত্র সূর্য কিংবা চন্দ্র যখন সমগ্র পৃথিবী আলোকিত করতে পারে, সেখানে ধর্ম বর্ণ সম্প্রদায়ের সীমাবদ্ধতা দিয়ে আর কতটাইবা অগ্রবর্তী হবে মানুষ? যে শিশুটি এমন করে ভাবতে শিখে গেল, সেই একদিন কণ্ঠে তুলে নিল অধুনাবাদ। অধুনাবাদকে সে এই প্রাকৃতিক অসীমতা, মহত্ত্ব ও বর্ণগন্ধসম্প্রদায়হীনতা দিয়ে অনন্য করে তুলতে চায়। তাই যে যত দূরেই বিস্তৃত হোক ফিরে আসবে স্বভূমির কাছে, প্রকৃতির কাছে, অসীমতার কাছে, শেকড়ের কাছে, বহু বহু পূর্বে থেকে চলে আসা এর ধারাবাহিকতার কাছে।

শিশুটি এত বড় হলো, শিশুটি সকল বাধা ডিঙাল, শিশুটি প্রাচীরও পেরুল, হয়তো কখনো শুরু হবে তার পড়ন্ত বয়স, কিন্তু তার ভাবনা ও ব্যাপ্তি বড় হতে থাকবে সেই প্রকৃতিকে ঘিরে, সেই শৈশবের দেখা উন্মুক্ত জানালা দিয়ে, প্রকৃতি থেকে পাওয়া মহত্ত্ব দিয়ে, প্রকৃতিনিসৃত সমানাধিকারের নিক্তিতে। সে দেখবে যে, তার হাতে যত ক্ষমতা রয়েছে, তার হাতে যত নতুনত্ব রয়েছে, তার হাতে যত বিস্ময় রয়েছে, যে কোনো কৃত্রিম ভাবনাই তা তাকে দিয়ে পারে নি। তাই অধুনাবাদ বারবার তার ভাবনার জন্য ঋণী প্রকৃতির কাছে। নিজের ভাবনাকে সমন্বিত করে প্রকৃতি প্রদত্ত চেতনায়।

অধুনাবাদ তাই প্রকৃতির বৈচিত্র্যায়নে পাল তুলে দিয়ে নিরন্তর নতুন নতুন আবিষ্কারে এবং ভাবনায় নিজেকে নিমজ্জিত রেখেছে। মূল কাণ্ড শাখাপ্রশাখা ছাপিয়ে সে সর্বদা উড়ে বেড়ায় পাতায় পাতায়। তার ভাবনারা পাতায় পা রেখে হাত পাতে অসীমে। আকাশে। নক্ষত্রে। নীলে। হাত ভরে তুলে আনে নতুনত্ব- কবিতার জন্য, পাতাল থেকে তুলে আনে মহার্ঘ নিশ্বাস- বেদনাকে শাণিত করতে, আনন্দকে অভিনন্দিত করতে। শিল্পীর কণ্ঠে, চিত্রকরের চিত্রে, রাজনীতিকের চেতনায় আরো আরো প্রথাভাঙার গান সুললিত করে ছড়িয়ে দিতে।

প্রকৃতি থেকে শেখা মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে আশ্রয় করে প্রকৃতিতেই সমন্বিত হতে চায় অধুনাবাদ। তাই তার প্রধান কাজ হয়ে পড়ে যে প্রকৃতিতে সে বড় হয়েছে, তার সমগ্র সৃষ্টিশীলতায় প্রবাহিত হোক তার সৃষ্টির ধারা। এভাবেই গড়ে উঠুক তার বিশ্ব। বরং বিশ্বই একদিন ঝুঁকে পড়–ক শিল্পীর প্রকৃতিমুগ্ধতায়।

অধুনাবাদে সৃষ্টিশীলতা কেন্দ্রমুখিনতায় স্থিত হতে হতে পৃথিবীর তাবৎ কেন্দ্রকে স্বকেন্দ্রিক করতে চায়। কেননা যে কোনো কেন্দ্রমাত্রই স্বতন্ত্র ও শক্তিমান। সুতরাং অধুনাবাদের কেন্দ্র সেরকম অবস্থানে থেকে সে স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ করবে, এবং বিশ্বের অপর কেন্দ্রগুলো তাদেরও স্বাতন্ত্র্যশক্তি প্রকাশ করতে করতে একদিন অপর কেন্দ্রীয় স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে একপ্রকারের সাযুজ্য খুঁজে পাবে।

সুতরাং এতকাল ধরে সৃষ্ট ধারণা কিংবা চিন্তাপদ্ধতির পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত হতে অপর ধারণাকেন্দ্রিক বিশিষ্টজনদের কোটেবল ব্যাখ্যা কিংবা উদ্ধৃতিজাত প্রামাণ্য প্রক্রিয়া অধুনাবাদে কখনো আশ্রয় পাবে না। অধুনাবাদ স্বতন্ত্র হতে হতে, নিজেদের ঐতিহ্য, স্বভূখণ্ডের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, ইতিহাস, প্রাগৈতিহাসিক ধারাবাহিকতা, ভাষার ক্রমবিবর্তন, চারিত্র্যের সুসমন্বয়- সর্বোপরি নৃতাত্ত্বিক ধারবাহিকতায় দ্ব্যর্থহীনভাবে আপোসহীন। অধুনাবাদ মনে করে ব্যক্তি থেকেই বহু, আর বহু থেকেই বিশ্ব। ব্যক্তি আবির্ভাব থেকে অতীতের আবির্ভূতের ধারাবাহিকতা। ব্যক্তিগত সৃষ্টি থেকেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব সামগ্রিক নির্মাণ কিংবা নির্মাণ কুশলতা। ব্যক্তিতেই সমগ্র অস্তিত্ব এবং অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখে তার চারপাশ। সব কিছুর ভেতর মন্দ লুকিয়ে থাকে, যেমন মন্দের ভেতর থাকে ভালো। সুতরাং দূর থেকে দেখা মহত্ত্ব, কাছে যেতে যেতে বিবর্ণ হয়ে যেতে দেখা যায়। অর্থনৈতিক বিবেচনা দিয়ে যে ভালোমন্দের বিচার করা হয়, তাই সর্বাধিক নিকৃষ্ট বিচার। একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দারিদ্র্যের পঙ্কিলতা সবার চোখে ছানি হয়ে পড়ে। তাই ক্ষমতা ও প্রভাবপ্রতিপত্তির পক্ষে এই ভালমন্দ বিচারের ভার কখনো বর্তালে তা যাবতীয় সৃষ্টিশীলতাকে উপহাস করবে। সৃষ্টিশীলতা সর্বক্ষণ ধরে রাখবে তার অহঙ্কার। তার আভিজাত্য। সে অর্থের প্রতি অন্ধ নয়, সে প্রতাপের প্রতি অনুগত নয়, নয় ক্ষমতার প্রতি নতজানু। সে শুধু ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। অধুনাবাদ এমন করে ভাবতে চায়। নিজের ভূখ-, নিজের অর্থনীতি, নিজস্ব পরিচয়, ব্যক্তিগত লোকাচার, শেকড়ের প্রতি বিশ্বাস, তা সে গঞ্জ কিংবা নগর যাই হোক না কেন, নিভের্জাল জাতীয়তাবাদ, নৃতাত্ত্বিক অভ্রান্ত ক্রমসম্পৃক্তি অধুনাবাদে আত্মপরিচয়ের প্রধান সূত্র। তাই যে শিশুটি অধুনাবাদের বুদ্বুদ কণ্ঠে ধরে অবির্ভূত হয়েছিল, সে এখন মৌলযৌবন, শাশ^ত্বে আসীন। কিংবা একদিন সময় ফুরিয়ে যাবে, পুনরাবির্ভাব হবে ভিন্ন সংস্কৃতি ভিন্ন লোকাচারে, ভিন্ন ঐহিত্য, অন্য জাতীয়তাবাদে- অধুনাবাদ তখন তাকেই যাপন করে যাবে। আজ যে বাংলার প্রত্যন্ত ভূখণ্ডে তার আবির্ভাব হলো, সেই গাঁওগেরামের ভূখণ্ডই হয়ে উঠল তার আত্মপরিচয়। সেই ভূখণ্ড থেকেই আহৃত হলো তার মৌলিক অভিজ্ঞান, খুঁজে নিল হারানো ঐতিহ্য, আবিষ্কার করে নিল নৃতাত্ত্বিক উৎপত্তি আর তার ক্রমবিকাশের ধারা, সৃষ্টিশীলতা।

অধনুবাদ তাই সকল প্রকার মৌলিক প্রথাকে গুরুত্ব দেয়নি। সকল প্রকার উচ্চাশাকে আমলে নেয়নি। বরং সে স্থানিক মৌলিকত্বকে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছে যে, তার শক্তিমত্তাই একদিন তাকে বৈশ্বিক করে তুলবে।

অধুনবাদ : বৈশিষ্ট্যাবলী:

অধুনাবাদ একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক চিন্তা পদ্ধতি। এটি কোনো তত্ত্ব বা ইজম নিসৃত বা ধারাবাহিক চিন্তা নয়। এটি সম্পূর্ণই মৌলিক এবং বাংলার মানুষ, মাটি, বাতাস, জল থেকে নিসৃত। এই চিন্তা পদ্ধতির প্রাথমিক কিছু বৈশিষ্ট্য এখানে তুলে ধরা হলো, যা পরবর্তীতে আরো সংশোধিত ও পরিবর্ধিত-পরিমার্জিত হতে পারে।

১. মানুষের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের চেয়ে বড় কোনো ভূমিকা থাকতে পারে না। এটি সর্বার্থে মৌলিক। সাহিত্য-শিল্প-রাজনীতি... যার কথাই বলি না কেন, সর্বক্ষেত্রে আত্মজিজ্ঞাসার ভিতর দিয়ে আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের প্রক্রিয়াকে সর্বাগ্রে উৎসাহিত করে অধুনাবাদ।

২. অধুনাবাদ এমন একটি চিন্তা পদ্ধতি যেখানে সহজে সবাই অংশ নিতে পারবে। কারণ আমরা মনে করি যে মানুষটি সম্পূর্ণ অশিক্ষিত, তারও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা আছে। তাই এটি প্রকাশের ভাষা হবে সহজ সরল। এর ভাষা যেন সহজে হৃদয়ঙ্গম করে সবাই তাদের মত ব্যক্ত করতে পারে, সে ব্যাপারে লেখক এবং বক্তাগণ সদা তৎপর থাকবেন। এটি কখনো কবিতা মতো করে রহস্য সৃষ্টি করবে না।

৩. সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, প্রতারণা, জিঘাংসার বিপরীত মেরুতে একদিন সদ্যোস্ফুটিত সমান দুটি কুড়ির মতো জন্ম নিয়েছে অধুনাবাদ।

৪. সকল প্রকার অজনচিত, অবিবেকী প্রবণতার বিরুদ্ধে অনড়-অক্ষত থাকবে অধুনাবাদ।

৫. অধুনাবাদের একটি প্রধান প্রবণতা হলো : অতীত সাফল্যের প্রতি সম্মান রেখে এই চিন্তা নতুন নতুন মেধার আগমনকে প্ররোচিত করবে। এবং যে মেধা তারা বহন করে এনেছে সেটুকুকে বিকশিত ও গবেষণাবদ্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।

৬. আমাদের ঐহিত্য ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে তরুণরা যাতে যথার্থ সত্যজ্ঞানে অনুধাবন করতে পারে এটা অধুনবাদের চর্চাম-লীতে সদা সংযুক্ত। কোনো প্রকার বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সতর্ক সংকেত ব্যবহার করবে অধুনাবাদ।

৭. অতীতের কোনো মতবাদকে গ্রহণ কিংবা খারিজ করার প্রবণতা অধুনাবাদে সূচিবদ্ধ নয়।

৮. কোনো উত্তর-পশ্চিম ইজমের প্রতি অধুনাবাদ মোহান্ধ নয়। তা দেখে আমাদের কোনো চোখ টাটানি নেই। বরং পশ্চিমই এখন অধুনাবাদে সম্পৃক্ত হয়ে ডানা মেলে উড়তে পারবে। এখানে সেই জানালা আবিষ্কৃত আছে।

৯. কারো উদ্ধৃতি ব্যবহার করে কোনো সত্য প্রতিষ্ঠার করার পক্ষে অধুনাবাদের কোনো অবস্থান নেই। কারণ যে কোনো উদ্ধৃতি কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে, বিশেষ সময়ে করা হয়ে থাকে। সেই বাস্তবতা সব সময় নাও থাকতে পারে।

১০. অধুনাবাদ এমন ভাষায় কথা বলবে না, যা তারা নিজেরাই বোঝে না। কথাটি এ কারণে বলা যে, অনেক চিন্তা চর্চাকারী এমনভাবে বইয়ের ভাষায় কথা বলেন যা তারা নিজেরাই বোঝেন কিনা সন্দেহ। আর অন্যেরা বোঝা তো দূরের কথা।

১১. অধুনাবাদ আজ যাত্রা শুরু করলো। এবং কালশেষে সে একটা কিছু বিশেষ মেসেজ দিয়েই যাত্রা অব্যাহত রাখবে। কেউ যেন প্রশ্ন করতে না পারেন যে, দিন শেষে কী দাঁড়াল।

১২. এই চিন্তা প্রদ্ধতি তারুণ্যের অর্জিত মেধাকে নিরন্তর প্রশ্নবিদ্ধ করে যাবে।

১৩. অধুনবাদ নতুন নতুন ভাবনার সংকলিত পরিভাষা। যে মেধা আপনার মধ্যে সহজাতভাবে ঢুকে আছে, তাকে নাড়িয়ে দেয়া অধুবাদের ইচ্ছায় লিপিবদ্ধ।

১৪. অধুনাবাদ সৃষ্টিশীলতাকে এমন ব্যাখ্যায় পর্যালোচনা করবে, যা তার সম্পূর্ণ নিজস্ব।

১৫. অধুনাবাদের কোনো প্রি কাঠামো নেই। কোনো পূর্বভাবনার অন্ধ অনুসারী নয়।

১৬. নতুন নতুন সৃষ্টি থেকে, ভাবনা থেকে নিরন্তর নতুন নতুন গতিপথ খুঁজে নেবে অধুনাবাদ। তাই এটি গড়পড়তা কোনো ইজম নয়। এটি হচ্ছে চিন্তার ক্রমউড়াল পদ্ধতি। ক্রমবিকশিত অসমাপ্তি।

১৭. অধুবাদে আগ্রহীগণ নিরন্তর খেয়াল করবেন, এর পর কী কথা বলবে অধুনাবাদ, এরপর কী বলবে, এই অপেক্ষা তাদের চলতেই থাকবে। তাই ব্যাপারটি অভাবিতভাবে চ্যালেঞ্জিং।

১৮. কী করে নতুন নতুন চিন্তার উত্তরণ ঘটছে, কী করে সহজাত মেধাগুলো ক্রিয়াশীল হয় কিংবা নিষ্ক্রিয় থাকে। অধুনাবাদের বিশেষ পর্যবেক্ষণে তা অর্থপূর্ণ ভাবনায় রূপ পাবে।

১৯. অধুনাবাদ কবিতার ব্যাকরণকে পুনর্বিবেচনা করবে। প্রথাগত ছন্দের প্রয়োগ সেটা প্রাথমিক কিংবা পরিণত পর্যায়ে হোক; মোটেই বাধ্যতামূলক নয়। ছন্দকে অন্য দশটি সহয়াক অনুষঙ্গের মতোই বিবেচনা করবে অধুনাবাদ। তবে তার আগে চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও শেকড়জাত মেটাফরিক উদ্ভাবন অধুনাবাদে অগ্রাধিকার পাবে।

২০. অধুনাবাদ কবিতায় চিত্রকল্প কিংবা শিল্পের ভাষা নির্মাণে জোরজবরদস্তিকে মোটেই প্রশ্রয় দেবে না।

২১. অধুনাবাদ ভাষার সারল্যে ও বোধের গভীরতা সৃষ্টিতে নিয়ত ক্রিয়াশীল।

২২. অধুনাবাদ সবসময় নতুন নতুন বিষয়ের সংযুক্তিতে বিশ্বাসী। অসম্পূর্ণতার শেষ নেই। অধুনবাদ নিজেই অসম্পূর্ণ। সুতরাং নিরন্তর প্রশ্নকে সে গ্রহণ করবে, নিজে প্রশ্ন করবে ও একের পর এক সিদ্ধান্তে নিজেকে সদা সমৃদ্ধ করে যাবে।

২৩. আমাদের চিন্তা থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ব্যাপারগুলো প্রতিনিয়ত বিবেচনাধীন থাকবে।

২৪. প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভ্রমণ করবে অধুনাবাদ তার নিজস্ব লাবণ্য ও মহত্ত্বচারণে।

২৫. অধুনাবাদ প্রকৃতিজাত, একদিন প্রকৃতিই হবে তার শেষ ঠিকানা। যে ধ্বংস সৃষ্টির কথা বলে, তেমন প্রকৃতির ভেতর আবার নিজেকে খুঁজে পাবে অধুনাবাদ।

***

এখানে অধুনাবাদী চিন্তাতাড়িত নিবন্ধকারের কিছু কবিতা তুলে দেয়া হলোঃ

সুলতানপুরের প্রতিপক্ষ

নিজের সাথে নিজের একবার যুদ্ধ হয়ে গেল-

প্রতিপক্ষকে বললাম:

আসলে তুমি কে?

প্রতিপক্ষ বলল:

আমি প্রতিপক্ষ। আর তুমি?

আমি বললাম:

প্রতিপক্ষ আমি

আমার পক্ষে দাঁড়াল সুলতানপুর

আর প্রতিপক্ষে-

কুমার নদের পার, ১২ নং ইউনিয়ন পরিষদ, ধুলো-ওড়া পথ, ষড়ঋতু

অন্তর্বর্তী প্রাচীন বিদ্যালয়, তেমাথা, বোর্ড অফিস, খেয়াঘাট

ডাকঘর-খলিলপুর বাজার, উপজেলা-রাজবাড়ী সদর, আর

জেলা : রাজবাড়ী

অভিনেতা তীর্থঙ্কর

তীর্থঙ্কর মজুমদার আমাদের বাড়ির ছেলে

তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেহারাটা দর্জিখানায় সেলাই হচ্ছে

চিবুকের প্রশ্রয় থেকে একগুচ্ছ চুল নাভির ওপর দোল খাচ্ছে

সকাল থেকে একটি কাঠকয়লার বাস এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে আঙিনায়

তাতে বসন্তকাল, কোকিলের ডাক

সারাদিন চড়ে বেড়াচ্ছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত

তীর্থঙ্কর, অভিনয়ের প্রাক-ভূমিকায়

তার গোফের ওপর বসিয়ে দিল নার্সারি। তাতে যা লাভ হলো :

ফুটে থাকা দুচারটি ফুলে আবশ্যক পারফিউমের কাজটি অন্তত হয়ে গেল

আর এখন তাতে ফল ধরবে- যা পেড়ে খেতে

তীর্থঙ্করের সস্নেহ আশীর্বাদ প্রয়োজন পড়বে তোমাদের

বিশুষ্ক বারতা

আব্বার কিনে দেয়া ছোট্ট নৌকোর গলুই ধরে

ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দেখি:

পৌঁছে গেছি কুমার নদের গভীরে-

দুই পাড়ে সারি সারি উৎসুক গাছ আর

আমি বসে আছি সুদীর্ঘ বাইচের নাওয়ের একমাত্র কা-ারি হয়ে

মনে মনে ভাবি, কোথায় দর্শক কেথায় মাঝিমাল্লার দল?

এত এত বাইচের নাও কখন গন্তব্যে পৌঁছাবে তারা?

চারদিকে মেঘ করে ব্যাকুল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল

পুকুর থেকে পাকা রাস্তায় লাফিয়ে উঠল বাড়িভর্তি যানবাহনের গান

টিনের চালে অঝরে পড়ছে প্রেম অথচ

বিন্দুমাত্র রিমঝিম তাতে নেই

জানালা-দরজা-ফাঁকফোকর ছাপিয়ে পড়ল বৃষ্টি

অথচ গড়ানো অশ্রুতে ভিজে-যাওয়া বালিশের ক্ষতে

লেখা সব নদীদের বিশুষ্ক বারতা

রূপনগর

রূপনগর আমার হাত থেকে একদিন কেড়ে নিয়ে গেছে চালতার ব্যাগ। আমার প্রিয় চালতাফুল, যাকে বড় হতে দিয়ে একদিন ছ’টাকায় উঠে পড়ি এই নগরের ট্রেনে; সঙ্গে ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ, কাগজী লেবু, অথৈ দীর্ঘশ্বাস... এই ফাঁকে মাটির হাঁড়িতে জল, শিং মাছের ঝোল- এই নিয়ে ট্রেনের কামরায় কামরায় কেউ গান ধরে দিলে ঝিলপাড় থেকে ডগাভাঙা দুবলার কষে কেউ কেউ ধুয়ে নেয় হৃদয়ের ক্ষত। আর তাতে বনমরিচ, বুনো বিছুটির মতো টগবগ করে ছুটে যায় ট্রেন উত্তরের দিকে। আর আমি দুধভরা গাভীর ওলান ভেবে দুই হাতে খুঁজে পাই পুরু ফ্রেমের তলে ফোলা ফোলা চোখের অসুখ। বাঁশবাগান, ঘাসফুল, প্রাচীন হালটের ঢালে বাতাবিলেবুর ফুলে এমন আষাঢ়ের দিনে, একদিন মৌমাছি তুলেছিল বৃষ্টির ভাষা; অথৈ সবুজ থেকে নুয়ে পড়া স্নেহের গভীরে বসে চালতাফুল, ক্রমে তারা ফিরে পায় বহুরঙ মানুষের রূপ।... রূপনগর, এই প্রিয় অভিবাস মুখরতা কোলাহলে ছায়াহীন ভালবেসে বসে আছে অজস্র স্টেশন শেষে

বৃষ্টির জন্য

বৃষ্টির ওপর ঘোড়া চাপিয়ে

বিদ্যালয় ঘরে নিয়ে এলো বাবা

মায়ের উৎকণ্ঠা তখন

টিফিনের মাছগুলো ভিজে জলে নেমে গেলে

আজ অনাহারে থাকত ছেলেটা!

বাবা ভাবছে, আর এমন হলে

মাছের ছেলেমেয়েগুলো

পুনর্বার ফিরে পেত তাদের বাবা-মায়ের ওম

এমন বৈপরীত্য সত্ত্বেও আজ

দীর্ঘকাল পর পেছনের জংধরা শাহী দরজাটা

বৃষ্টির জন্য খুলে দিল তারা

রক্তের ধারা

মাছবাজারে যে মাছটির দরদাম নিয়ে

কথা কাটাকাটি হাতাহাতির দিকে যাচ্ছিল-

তার পাশের ডালা থেকে একটি কর্তিত কাতলের মাথা

আমার ব্যাগের ভেতর লাফিয়ে ঢুকে গেল

তখন মস্তকবিহীন কাতলের অবশিষ্ট দেহের দিকে তাকাতেই

আমার সমস্ত শরীর রক্তে লাল হয়ে গেল

কাতলের যিনি প্রকৃত ক্রেতা ছিলেন

মানিব্যাগ থেকে মূল্য পরিশোধ করে বললেন-

“এ নিয়ে কিছু ভাববেন না হে

আজকাল মাছেরা যেভাবে রক্তপাত করতে শুরু করেছে

এভাবে চললে আপনি-আমি সবাই এমন রক্তে নেয়ে যাবো”

আর তৎক্ষণাৎ বাজারের সকল মৎস্যবিক্রেতা যার যার রক্তের ধারা

আবিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে গেল

কেউ বলল: আমি সেন বংশজাত, আমি পাল বংশোদ্ভূত, আমি...

এবং দেখা গেল, বাজারে যে ক’জন ক্রেতা ছিলেন

শুধু তারাই ছিলেন মীনবংশজাত

যারা নিজেরাই নিজেদের মাংস ভক্ষণ করতে

বাজারে এসে কথা কাটাকাটি থেকে রক্তারক্তি পর্যন্ত চলে যেতে পারে

সম্পাদকীয় নোট

কৃষ্ণচূড়ার বেদিতে যখন

একক বক্তৃতা দিতে দাঁড়াতাম

প্রগাঢ় নিস্তব্ধতায় শ্রোতা হতো

ভাতশালিক-দোয়েলের অঢেল কথকতা

এভাবে রচিত হতো সুলতানপুরের ক্যানভাসে

সম্পাদকীয় নোট

বৃক্ষপত্রে-বাকলে পত্রিকার শিরোনাম হতো

কানাকুয়োর কানকথা, ডাহুকের প্রসব বেদনা

আর আলোকচিত্র জুড়ে বসতো

ময়না-সারস টিয়ে-মাছরাঙার প্রেম

ফুলেদের জীবন ফুরাত দেবতার নৈবেদ্যে

আর মানুষ নিজেকে হারাত জনহিততায়

একক বক্তৃতার কোনো ধারাবিবরণী

কখনো কি ঠাঁই পেয়েছিল পাখিদের প্রচারযন্ত্রে!

শালুক ও অধুনাবাদ : চিন্তনের যৌক্তিক কাঠামো এবং শ্রেয়বোধের উজ্জীবন

image

সাহিত্য ও চিন্তাশিল্পের লিটল ম্যাগাজিন শালুক ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করে ইতোমধ্যেই গৌরবের বিশ বছর অতিক্রম করেছে। দেশি-বিদেশি

পুষ্পিতা দাস পিউ এর গল্পগ্রন্থ “আড়াল”

প্রতিনিধি, জবি

image

অমর একুশে বইমেলা ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে জবি দর্শন বিভাগের ছাত্রী পুষ্পিতা দাস পিউ এর গল্পগ্রন্থ “আড়াল”। বইটি প্রকাশ করেছেন ভাষাচিত্র

মধ্যযুগে বাংলার ইতিহাস গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

image

বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মো. শহীদুর রহমানের ‘মধ্যযুগে বাংলার ইতিহাস’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান গত ২২ ফেব্রুয়ারি

sangbad ad

কবি ভাগ্যধন বড়ুয়ার দুটি বই প্রকাশিত

সাংস্কৃতিক বার্তা পরিবেশক

image

সময়ের সক্রিয় কবি ভাগ্যধন বড়ুয়ার এবছর প্রকাশিত হয়েছে দুটি গ্রন্থ। একটি ইংরেজি কবিতার সংকলন, অন্যটি বাংলা। দুটি বইই কবিতার এবং

বাংলাদেশের কবি ওবায়েদ আকাশ ও ভাগ্যধন বড়ুয়া যোগ দিচ্ছেন প্যারালাল লিটারেচার ফেস্টিভ্যালে

সাংস্কৃতিক বার্তা পরিবেশক

image

রাজস্থানের রাজধানী জয়পুরে অনুষ্ঠিতব্য তিনদিনব্যাপী প্যারালাল লিটারেচার ফেস্টিভ্যালে যোগ দিচ্ছেন কবি ও দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য

বইমেলায় কবি ওবায়েদ আকাশের দুই বই

সাংস্কৃতিক বার্তা পরিবেশক

image

সময়ের আলোচিত ও ব্যতিক্রম ধারার কবি ওবায়েদ আকাশের দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও শৈশব

বইমেলায় কবি হাইকেল হাশমীর দুটি গ্রন্থ

সাংস্কৃতিক বার্তা পরিবেশক

image

বহুমাত্রিক লেখক হাইকেল হাশমী। একাধারে কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদকসহ একজন সফল ব্যাংকার। এবছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত

নিমগ্ন নির্জন কাব্যগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

image

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীর লেখা ‘নিমগ্ন নির্জন’ কাব্যগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচিত

নানা রকম বই ও লোকসমাগমে জমে উঠছে প্রাণের মেলা বইমেলা

তারেক আজিজ

image

অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে বই প্রকাশের ধুম পড়ে যায় বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আয়োজিত এ মেলা রীতিমতো

sangbad ad