• banlag
  • newspaper
  • epaper

ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৯ মার্চ ২০২১

 

বিপন্ন বিস্ময়ের খোঁজে জীবনানন্দ দাশ

ওবায়েদ আকাশ

নিউজ আপলোড : ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১

image

জীবনানন্দ দাশ / জন্ম : ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯; মৃত্যু : ২২ অক্টোবর ১৯৫৪ প্রতিকৃতি : বাবুল দে

মহাসমুদ্রের উচ্ছ্বসিত ঢেউয়ের মতো আধুনিক বাংলা কবিতার সরোবর কাঁপিয়ে দিয়ে যান জীবনানন্দ দাশ। মাত্র চুয়ান্ন বছরের জীবনে বাংলা ভাষার সবচেয়ে প্রভাবশালী কবির ভূমিকায় এখনো অবিচল তিনি। তাঁর এই অপ্রতিদ্বন্দ্বি দাঁড়াবার দৃঢ়তা আরো কতোদিন রাজত্ব করে যাবে- তা গভীর ভাবনার।

আজকের জীবনানন্দ দাশ, আমাদের নিত্যদিনকার ভাংচুর ও বোঝাপড়ায় তাকিয়ে থেকে, কালিক মগ্নতায় ডুবে ছিলেন একবার মৃত্যুর রঙ, একবার জীবনের, আর শেষবার নক্ষত্র-প্রকৃতির রঙ চিনে নেবার ভাবালুতায়। সেই প্রকট বিদগ্ধতায় নিজেকে উজার করতে গিয়ে একদিন অগণ্য সঙ্গীতের সুরে কোনো মীমাংসা না করেই (মহা)‘মানব’ হয়ে গেলেন। ‘মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব / থেকে যায়’। সেই ভবিতব্যের অমীমাংসিত অধ্যায় তো দূরের কথা, আমরা তাঁর কবিতায় যতোটুকু মীমাংসার সন্ধানে এখনো জীবনানন্দ পাঠে শিহরিত হই; হৃদয়ের গভীর থেকে গভীর থেকে গভীর থেকে ভ্রমণ করতে করতে আমরা তার কতোটুকুইবা স্পর্শ করতে পেরেছি! একবার বিস্মিত হয়ে হয়ে ভাবি, পৃথিবীতে এতো এতো কবি দূরের নক্ষত্র জেলে অসীমে উজ্জ্বল হয়ে ভাসছেন, এই ‘বুড়ো পৃথিবী’তে চিহ্ন রেখে যাওয়া ওই যে অগণিত কবি অগণ্য ভাষার, কেউ কি জীবনানন্দের মতো এমন করে বিপন্ন বিস্ময়ের কথা শনাক্ত করতে পেরেছিলেন- এতোটা স্পষ্ট ভাষায়? আমরা হড়হড় করে কেবল পড়ে আসছি সেই কবে থেকে: “জানি- তবু জানি / নারীর হৃদয়- প্রেম- শিশু- গৃহ- নয় সবখানি; / অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়- / আরো-এক বিপন্ন বিস্ময় / আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে / ক্লান্ত- ক্লান্ত করে;” অথচ এই জাগতিক হিসাব নিকাশের জীবনে আমরা কখনো শিশু, নারী, খ্যাতি, সচ্ছলতার উপরে কিছু ভাবতে পারি বলে মনে হয় না। তবে তিনি এ কোন বিস্ময়ের কথা বলেন? এমন করেইবা কেন বলেন যে তার সমাপ্তি শুধু মৃত্যুতে! তার কোনো আরোগ্য কিংবা শুশ্রষা নাই। আমরা জানি, এমন করে ভেবেছেন যিনি, তিনি কেবল জীবনানন্দ দাশ। “আকাশের ওপারে আকাশ” খুঁজে পেয়েছেন যিনি- তিনি জীবনানন্দ দাশ। আবার মৃত্যুই শুধু নয়, তিনিই তো সেই কবি যিনি আমাদের শুনিয়েছেন চারদিকে কোলাহলের শব্দ, ভোরের পূর্বাভাস।

এতো বড় প্রতিভা তাঁর কালকে নাড়িয়ে দিতে গিয়ে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়েছিল কতিপয় অশক্ত ইমারত। আর তারই কিছু ইটসুড়কি তাঁর গায়ে এসে লেগে আহত করেছিলো বটে, তাতে কখনো ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন কবি, কিন্তু কখনো তাঁর ধী থেকে একবিন্ধুও নড়ানো যায় নি। তবে কি তিনি বুদ্ধের ধ্যানকে গভীরভাবে হৃদয়ে গেঁথেছিলেন? নয়তো কবিতায় এতো বড় নির্বাণের সুর তিনি কীভাবে রচনা করলেন? নাকি ঠিক লালনের মতো নয়, তবু লালনের মতোই ভিতরে ভিতরে ছিলেন ঘরছাড়া এক রাতের পরিব্রাজক। শ্মশানের সুর শুনে শিহরিত হওয়া এক অন্ধকারের জোনাকিমানুষ?

কিন্তু শেষতক তিনি কার কাছে গিয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন ক্ষণিকের আশ্রয়? সে কি বলনতা সেন, সে কি কোনো অধরা? সে কি কোনো ইতিহাস, সে কি কোনো কল্পনাপ্রতিভা নাকি সে মৃত্যুর অভিরূপ এক পরম প্রশান্তির নাম? সে কি হেমন্ত, সে কি বাংলার বিশাল প্রকৃতি, সে কি ধানসিড়ি-বিশালাক্ষী নাকি কাশ-গোগলার মাঠ? সে কি ভোরের আলো, সে কি সমস্ত দিনের শেষে নেমে আসা গোধূলি? কী ছিলো তার আশ্রয়ের ভাষা? তার প্রিয় কোনো কবি- ডব্লিউ বি ইয়েটস, ডি এইচ লরেন্স, এডগার এলান পো, জন কিটস নাকি সে অন্য কোনো নাম- শেফালিকা, সুচেতনা, সরোজিনী কিংবা নিকাটাত্মীয়া শোভনা? আমরা কি ভেবে নিতে পারি তাঁর স্বীয় স্ত্রী লাবণ্য দাশের কাক্সিক্ষত প্রতিরূপই ছিলো এই মহান কবির আরাধ্য আশ্রয়? কোথায় তিনি এসেছেন মীমাংসায়? এর উত্তর কি দিতে পারবেন বুদ্ধদেব বসু, দিতে পারবেন ভূমেন্দ্র গুহ কিংবা আরো আরো প্রাজ্ঞজন, জীবনানন্দ গবেষকগণ? কিংবা এর উত্তর কি জানেন জীনাননন্দের কোনো নিরীহ পাঠক, বিদগ্ধ পাঠক, নিমগ্ন পাঠক, নিবেদিত পাঠক? প্রকৃতই কার জন্য জীবনানন্দ দাশ সমগ্র একটি জীবন শুধু পৃথিবীর জন্ম থেকে বিস্তৃতি, পৃথিবীর স্বভাব চলমানতার মাঝে বিস্ময় স্থবিরতা, মানুষের সহজতার মাঝে জটিলতা, চঞ্চলতার মাঝে নিঃসঙ্গতা কিংবা অপার আনন্দময়তার মাঝে বিষণ্নতার গীতগান গেয়ে ফুরিয়ে দিলেন? তাঁর কবিতা কী বলে? উপন্যাস বা গদ্যের ভাষায় কীইবা রচিত আছে? কেন তাঁর পান্ডুলিপি ধূসরতায় ছেয়ে আসে, তারার তিমিরে ঢেকে য়ায়, ঝরা পালক হয়ে পড়ে যায়, বেলা অবেলা হয়ে কালবেলায় পতিত হয়? কেন তিনি এই মহাপৃথিবীতে খোঁজেন মানুষের রক্তপাত কিংবা বিগত রাজাদের নিশ্চিহ্ন হবার করুণ পরিণতি? বাংলার বিচিত্র ঋতুচক্র আর তার ত্রস্ত নীলিমায় কোনটুকু তার কাক্সিক্ষত মুহূর্ত? এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে ফুরিয়ে আসে জীবনানন্দের কাব্য সমগ্রের পাতা। আরো প্রশ্ন জাগে, আরো অরো রহস্যের আড়ালে ক্রমশ গাঢ় হয় অন্ধকার, আর একবার উজ্জ্বলতর হয় দিন- আর যে সর্বক্ষণ চলে মেঘরৌদ্র আর আলো আঁধারের খেলা- সেই জীবনানন্দ দাশ আমাকে আচ্ছন্ন করে। আমাকে বিপুল করে, আমাকে অসহায় করে। আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাঁর সঘন রহস্যময়তায়।

তাঁর মৃত্যুচেতনা, প্রেম, নিসর্গপ্রিয়তার

চেয়ে যে ব্যাপারগুলো অনিবার্যভাবে তাঁকে মানুষের ঢের কাছে নিয়ে এসেছে- তা নিঃসন্দেহে অবহেলা, উপেক্ষা এবং প্রত্যাখ্যান। যুবক বয়স থেকে শেষাবধি তিনি প্রায় সর্বত্র প্রত্যাখ্যাত ও উপেক্ষিত হয়েছেন

আবার প্রশ্ন জাগে কোথায় পেলেন তিনি এই নিভৃতি? কোথায় লুকানো ছিলো তাঁর এই যুগযন্ত্রণার অগ্রণী আখ্যান? কার সুপরামর্শে তিনি অগ্রসর পৃথিবীর গাথায় নিজেকে করে তুললেন অতুলনীয়! না তাঁর অগ্রজ রবীন্দ্রনাথ নয়, নয় মাইকেল কিংবা মধ্যযুগের বাংলা কাব্যের সোনালি ফসল। প্রথমে নজরুল-সত্যেন্দ্রনাথ হয়ে কী করে দ্বিতীয়গ্রন্থে বিনির্মিত হলো সম্পূর্ণ নিজের এক কাব্যপরিভাষা? ইংরেজি ভাষার এমএ, ইংরেজি সাহিত্যের সর্বভুক পাঠক কী করে বাঙালির নিজস্ব ঐহিত্যের কবি হয়ে গেলেন!

তবে কি এ কারণেই তাঁর সমালোচনা এই অধুনাবাদী যুগে, কথিত উত্তর আধুনিক যুগের কবিদের ভাষায় যে, তিনি প্রকৃত কবি নন, তিনি মূলত ইংরেজি ভাষার কবিতার অনুবাদক। ধরে ধরে অনেকে টেনে বার করলেন সে সময়ের খ্যাতিমান ইংরেজ কবিদের ছায়াবলম্বনে রচিত তাঁর বিখ্যাত কাব্যপঙ্ক্তিমালা। তবে সাহিত্য কী? সাহিত্য কি এক ধরনের পূর্বসূরিদেরই ধারাবাহিকতার নবায়ন নয়? সে কাজ কি রবীন্দ্রনাথ করেননি তাঁর সঙ্গীতের সুর নির্মাণের বেলায়? তিনি কি আচ্ছন্ন হননি লালনে কিংবা গগন হরকরায়? মাইকেল কি ইংরেজিমুগ্ধ হয়ে ইংরেজি কাব্যই রচনা করতে চাননি? তবু তিনি কি সেই কপোতাক্ষের কাছে, সাগরদাড়ির কাছে তাঁর ঠিকানা আবিষ্কারে সমর্থ হন নি? ভার্জিল যখন হোমারের পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি তুলে দিয়ে ‘ঈনিড’ রচনা করলেন, তখন কি সমালোচিত হননি তিনি? কিন্তু ভার্জিল কী করেছিলেন? তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ছিলেন, হ্যাঁ, আমি হোমার থেকে গ্রহণ করেছি, এবং এটা নিয়ে আমি গর্ববোধ করি।

তবে কেন জীবনানন্দ দাশকে ইংরেজ কবিদের ছায়াবলম্বনে দুএকটি কবিতা লেখার অপরাধে এতো বড় খেসারত দিতে হবে? কিন্তু সত্যি কথা হলো- অনুসরণ অনুকরণ করার ক্ষমতা থাকা চাই। সে ক্ষমতা সব প্রতিভানের থাকে না। বড় প্রতিভাবানরা অনুসরণ অনুরকণ দিয়ে শুরু করে আবার তা ছুড়েও ফেলে দেন। যেমন দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ। কে যেন বলেছিলো, প্রতিভাবানরাই প্রভাবিত হন। প্রভাবিত হন বড় কবি দ্বারা। আগেই বলেছি, জীবনানন্দ দাশ এমন এক কবি যাকে কোনো সৃজনশীল ব্যক্তির বেশিক্ষণ পাঠ করার ক্ষমতা নাই। কারণ জীবনানন্দ এতোটাই তীব্র যে, তিনি অকারণেই প্রভাবিত করেন। মেধাবীদের বেশি বেশি করে প্রভাবিত করেন। জীবনানন্দ পড়তে বসলেই তাঁদের ক্রিয়েটিভিটি উচ্ছ্বসিত ওঠে। লিখতে শুরু করেন নিজেই একটি কবিতা। এ ক্ষমতা সবার কবিতায় থাকে না। বড় কবিরা যেমন দ্রুতই প্রভাবিত করেন, তেমনি কবিরা প্রভাবিতও হন অন্য বড় কবিদের দ্বারা। এ খেলা চলতেই থাকে, চলবেই। এ খেলা খেলেছেন জীবনানন্দ দাশ। কিন্তু আজ যে জীবনানন্দ দাশকে আমরা আবিষ্কার করি- নিন্দুকের পাঠ না নিয়ে কেউ কি এত সহজেই বলে দিতে পারেন যে, জীবনানন্দ দাশ আমাদের জাতীয় কবির মর্যাদা পাবার যোগ্য নন? তাঁর মতো কে ভালোবেসেছে বাংলার নিসর্গ মৃত্তিকা জলহাওয়া আর নদী মাঠ সমুদ্রকে? কে বেশি গুণ গেয়েছে বাঙালির কিংবা বাংলার শ্যামলহরিৎ মোহাচ্ছন্ন প্রকৃতির। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে কোনো নিমগ্ন পাঠক কি এ অভিযোগ তুলতে পারবেন যে, তিনি ইউরোপীয় কাব্যধারায় কবিতা লিখে বাংলাকে সেই ধারায় উপস্থাপন করেছেন? জসীম উদ্দীনও আধুনিক কবি ছিলেন। তিনি গ্রাম্য নন। তিনি শহরে বসেই এই গ্রামীণ কবিতা লিখেছেন। তাঁকে ‘পল্লীকবি’র তকমা দিয়ে দূরে ঠেলবার প্রয়াস লক্ষণীয়। কিন্তু একসময়, এমনকি আজো কারো কারো মধ্যে তাঁর কাব্য, আলেখ্য, নাটক, সঙ্গীত রেখাপাত করে। কিন্তু জীবনানন্দের গ্রহণযোগ্যতা সর্বপ্লাবী। কারণ সময় বদলেছে। জীবনানন্দ দাশ আরো অগ্রসর ভাষাকে বেছে নিয়েছিলেন। আরো বলিষ্ঠ আঙ্গিক, প্রকরণ বেছে নিয়েছিলেন, যা দূরবর্তী প্রত্যাশার। কিন্তু তারো চেয়ে বড় কথা তিনি মানুষের মনোজগতের গভীর গভীরতর তলে ডুব দিয়েছিলেন- কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা তাঁর কোনো সীমা নির্ধারণ করতে পারি না। তাঁর মানস বিচরণ যে কতোটা সুদূরের আর প্রাখর্যের তা আবিষ্কার করতে হয়তো আমাদের আরো আরো নতুন পৃথিবীর আশ্রয় নিতে হবে। তাঁর সেই অনুদ্ধারিত জগত আবিষ্কার করতে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে এক অপরিচিত পৃথিবীতে-

আমার এ জীবনের ভোরবেলা থেকে-

সে-সব ভূখন্ড ছিলো চিরদিন আমার;

একদিন অবশেষে টের পাওয়া গেল

আমাদের দু’জনার মতো দাঁড়াবার

তিল ধারণের স্থান তাহাদের বুকে

আমাদের পরিচিত পৃথিবীতে নেই।

[ভাষিত, সাতটি তারার তিমির]

জীবনানন্দ দাশ জানতেন, পৃথিবীতে বহু বহু নেশন, বহু বহু নৃপতি ধ্বংস হয়ে গেছে। আবার ধ্বংস হয়ে যাবে এই বৃদ্ধ পৃথিবী, নতুন নতুন পৃথিবীর সাজ পরে নেবে অপার প্রকৃতি। সেই পৃথিবীতে সেই আলোকিত স্রোতে ফিরে আসবেন কবি, ফিরে আসবে মানুষ। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ এতোটাই প্রখর দৃষ্টিসম্পন্ন কবি যে, তিনি টের পান ‘লোকোত্তর সূর্যের আমোদে’ একদিন জেগে উঠবে সেই পৃথিবী। তিনি টের পান সেই উপস্থিতি। অনেক মৃত্যুর ভেতর, অনেক অনেক হেমন্তের পাতা ঝরার ভেতর, অনেক নিশ্চতেনার ভেতর, অনেক সূর্যাস্তের ভেতর, অনেক দিবসের অবসান শেষে, অনেক অজস্র গোধূলি লগ্নে, অবশেষে প্রগাঢ় রাত্রি নেমে এলে তার অবসানে এক ভোরের পৃথিবী, আলোর পৃথিবী দেখতে পান তিনি। আশ^স্ত হন, “কোথাও ভোরের বেলা র’য়ে গেছে- তবে।” তিনি হতাশাবাদী নন, তিনি কেবলই অনিবার্য মৃত্যু প্রত্যাশী নন। তাঁর শুধু জাগে না মরে যাবার সাধ। যে তাহাকে ভালোবাসিয়াছে, যে তাহাকে ঘৃণা করিয়াছে, যে তাহাকে অবহেলা করিয়াছে, তার সঙ্গে বোঝাপড়ার সাঙ্গ হয় কবির। তিনি রচনা করেন, একের পর এক কাব্য। একের পর এক উপন্যাস, একের পর এক গল্প। প্রবন্ধ লেখেন পাঠককে শিক্ষিত করতে। তাঁর যে কবিতার ভুবন তিনি রচনা করে যান, হয়তো ঢের বেশি টের পান তিনি, আর কী বলবার থাকে, আর কী অবশিষ্ট আছে জানাবার, এই দেহ একদিন ভাগাড়ে আশ্রয় পাবে তবু, জীবন হবে না শেষ। পৃথিবী ফুরিয়ে যাবে তবু পৃথবীর পথে পথে হেঁটে যাবে স্বপ্নের যাত্রা। সে যাত্রার বর্ণনা করেন-

কোথাও ডানার শব্দ শুনি

কোনোদিকে সমুদ্রের সুর-

দক্ষিণের দিকে,

উত্তরের দিকে,

পশ্চিমের পানে।

...

সূর্যালোকিত সব সিন্ধু-পাখিদের শব্দ শুনি;

[প্রাগুক্ত, সূর্যতামসী]

যতোদিন বনলতা আছেন, ততোদিন আশা আছে কবির। ততোদিন সৃষ্টি আছে কবিতার। ততোদিন আয়ু আছে পৃথিবীর। যতোদিন সৃষ্টি আছে- হাজার বছর ধরে খেলা করে সৃষ্টির সারসেরা। একদিন সব কিছুই শেষ হয়ে যায়, ভেঙে পড়ে বয়সী পৃথিবী। তবু কবিকে জাগাবার থাকে কেউ। কেবল প্রবল কল্পনাপ্রতিভার কবিই টের পান, তাঁর উপস্থিতি কালে কালে নতুন পৃথিবীতে। বনলতা, সুরঞ্জনা থেকে পৃথিবীর অধরা রূপসী তারা- যারা বারুদের মতো। বলেন কবি বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, “মেয়েমানুষ তো বারুদ / প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এই হচ্ছে ভালোবাসার বারুদ।” তারাই বাঁচিয়ে রাখে জীবনানন্দ দাশের মতো কবিকে। অথবা বনলতাদের মতো লিঙ্গ নির্বিশেষে মানবোর্ধ কেউ ঢের দিন বাঁচিয়ে রাখে পৃথিবীর জেনুইন কবিদের। জীবনানন্দও বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন- সব শেষ হয়ে গেলেও এই আহ্বানের ভিতর।

শরীরে ঘুমের ঘ্রাণ আমাদের- ঘুচে গেছে জীবনের সব লেনদেন;

‘মনে আছে?’ শুধালো সে- শুধালাম আমি শুধু, ‘বনলতা সেন?’

[হাজার বছর শুধু লেখা করে, বনলতা সেন]

মৃতদেহে প্রাণসঞ্চার করে যে, সেই তো বনলতা সেন, সে কি কোনো মানবী, সে কি কোনো ঈশ^রী, সে কি কোনো দেবি, সে কি কোনো কৃষককন্যা, সে কি উচ্ছল বালিকা কোনো, নাকি সে কেবল নিতান্ত আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রতীক, নির্বিঘœ খ্যাতির প্রতীক? এসব প্রশ্নের উত্তর না পেয়েও বলা যায়, পৃথিবীর প্রবল কল্পনাধর, শক্তিধর, প্রবল মেধাবী কবিদের পৃথিবীর পর পৃথিবীতে আবাসন নিশ্চিন্ত হয়ে যায়। তাঁদেরকে বাঁচিয়ে রাখেন হয়তো মানবোত্তর, দেবোত্তর কোনো প্রতীক। জীবনানন্দ দাশ সেই বেঁচে থাকা কবি।

কারণে অকারণে চাকরি থেকে প্রত্যাখ্যাত হবার মতো ঘটনা ঘটেছে। তাঁর একরকম উপার্জনহীন সংসার জীবনের দারিদ্র্য উচ্চাভিলাষী সুদর্শনা স্ত্রী লাবণ্য দাশ সহ্য করতে পারেননি। জীবনানন্দ নিজেও যে এর জন্য লজ্জিত ছিলেন না, তা নয়

কেন বেঁচে থাকবেন জীবনানন্দ দাশ, কেন বেঁচে থাকবে জীবনানন্দের আদর্শ, কেন বেঁচে থাকবেন এমনকি ব্যক্তি জীবনানন্দ? এ তাঁর কবিতার মতোই এ প্রশ্নের উত্তর প্রবল রহস্যময়। তবে এতোটুকু জাগতিক সত্যে ভর করে বলা যায় যে, তিনি তাঁর কবিতার বিষয় নির্বাচনে এমন কিছু জায়গায় ঝরনাধারা বইয়ে দিয়েছেন- মানুষ কিছুতে এড়াতে পারে না। তাঁর মৃত্যুচেতনা, প্রেম, নিসর্গপ্রিয়তার চেয়ে যে ব্যাপারগুলো অনিবার্যভাবে তাঁকে মানুষের ঢের কাছে নিয়ে এসেছে- তা নিঃসন্দেহে অবহেলা, উপেক্ষা এবং প্রত্যাখ্যান। যুবক বয়স থেকে শেষাবধি তিনি প্রায় সর্বত্র প্রত্যাখ্যাত ও উপেক্ষিত হয়েছেন। সেই সময়ের ইংরেজিতে এমএ এক যুবকের চাকরি নিয়ে হেলাফেলা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়, ভেবে নিতে পারি। কিন্তু তাঁর বেলায় এটি ঘটেছে- কারণ তখনকার বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা তখন স্বয়ং ভারতবর্ষকেও প্রভাবিত করেছিল। ক্রমেই ঘনিয়ে আসছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অপ্রতিরোধ্যতা। যে কারণে এতো উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষকেও বারবার চাকরি চলে যাবার মতো সংকটে পড়তে হয়েছে, নতুন চাকরি খুঁজতে হয়েছে। কারণে অকারণে চাকরি থেকে প্রত্যাখ্যাত হবার মতো ঘটনা ঘটেছে। তাঁর একরকম উপার্জনহীন সংসার জীবনের দারিদ্র্য উচ্চাভিলাষী সুদর্শনা স্ত্রী লাবণ্য দাশ সহ্য করতে পারেননি। জীবনানন্দ নিজেও যে এর জন্য লজ্জিত ছিলেন না, তা নয়। তাঁকে এই বয়সেও পরিবারের অন্যের উপার্জনের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। তারপর তাঁর লেখালেখি জীবনে রবীন্দ্রনাথের মতো বড় প্রতিভার কাছেও প্রশ্রয় পাননি। শনিবারের চিঠি, সজনিকান্ত দাশ থেকে শুরু করে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, পরিচয় সবাই মিলে তাঁকে উপহাস করেছে। তাঁকে ‘জীবনানন্দ’ না বলে ‘জীবানন্দ’ বলে তিরস্কার করেছেন, গন্ডারের সঙ্গে তুলনা করেছেন, গেঁয়ো আনস্মার্ট বলে কবিতা মুদ্রণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এতো এতো প্রত্যাখ্যন ব্যক্তি জীবনানন্দ এবং তাঁর কবিতা- সব দিক থেকে মানুষের খুব কাছে স্থান দিয়েছে। বিশেষ করে এতো কিছুর ভেতরও তাঁর অটল অবিচল লেখালেখি এবং সম্পূর্ণ নতুন এক ভাষা ও উপস্থাপনার আবিষ্কার তাঁকে বুদ্ধদেব বসুর মতো তুখোড় কবি, পন্ডিত ও সাহিত্য সমালোকের হৃদয়ে স্থান করে দিয়েছে। পরবর্তীতে তাঁর জন্য যা করার ছিলো সকলের, তা মূলত বুদ্ধদেব বসু একাই করেছেন। এবং তাঁকে ‘আধুনিক কবিতার প্রধান পুরুষ’ বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

মানুষ শুধু কেন, প্রাণিজগতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর যে বিষয়, সেই মৃত্যুভাবনা জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তিতে অভাবিতভাবে জায়গাজুড়ে নিয়েছে। মৃত্যুভয়, মৃত্যু-আতঙ্ক, মৃত্যু-সচেতনতা, মৃত্যু-অবিবার্যতা মানুষের নিত্যদিনের ব্যাপার। মানুষের অতল বিবেচনায় কথা বলেছেন জীবনানন্দ দাশ তাঁর সমগ্র কাব্যজীবনে। তাঁর সবচেয়ে ভালোবাসার যে মৌসুম, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় যে ঋতু হেমন্ত, যেখানে তিনি প্রশান্তির আশ্রয় খুঁজে পান, যে ফসলের মাঠে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে সুখ খুঁজে পান সেই হেমন্তের বর্ণনায়ও বারবার উঠে এসেছে মৃত্যুর প্রসঙ্গ: “আজকে মানুষ আমি তবুও তো- সৃষ্টির হৃদয়ে/ হৈমন্তিক স্পন্দনের পথের ফসল; / আর এই মানবের আগামী কঙ্কাল;” (সাতটি তারার তিমির) কিংবা এই প্রিয় হেমন্ত ঋতুও একদিন পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবার আশঙ্কায় ব্যথাহত কবি : “হেমন্ত ফুরায়ে গেছে পৃথিবীর ভাড়ারের থেকে; / এ-রকম অনেক হেমন্ত ফুরায়েছে/ সময়ের কুয়াশায়;” (নাবিকী, প্রাগুক্ত) কিংবা যখন পৃথিবী রক্তাক্ত হয়, চারদিকে যুদ্ধের বারুদ ওড়ে, মাছির মতো ঝরে যায় সুন্দর, সেখানেও হেমন্ত কুয়াশার ভেতর দিয়ে দিনের সমাপ্তি দেখতে ভালোবাসেন:

তুমি সেই নিস্তব্ধতা চেনো নাকো; অথবা রক্তের পথে

পৃথিবীর ধূলির ভিতরে

জানো নাকো আজো কাঞ্চী বিদিশার মুখশ্রী মাছির মতো ঝরে;

সৌন্দর্য রাখিছে হাত অন্ধকার ক্ষুধার বিবরে;

গভীর নীলাভতম ইচ্ছা চেষ্টা মানুষের- ইন্দ্রধনু ধরিবার ক্লান্ত আয়োজন

হেমন্তের কুয়াশায় ফুরাতেছে অল্পপ্রাণ দিনের মতন।

[সিন্ধুসারস, মহাপৃথিবী]

জীবনানন্দ দাশকে এ গ্রন্থে অনেক বেশি রাজনীতি সচেতনও দেখা যায়। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁকে তাড়িত করে। তিনি হত্যালীলা ও লোভের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেন।

তাঁর গ্রহণযোগ্যতার আর যে অনিবার্য বিষয়, সেটি তাঁর প্রকৃতিচেতনা, প্রকৃতিমুগ্ধতা কিংবা নিসর্গপ্রিয়তা। এই হেমন্ত প্রকৃতিরই প্রাণ, প্রকৃতিরই আয়ু-খন্ডাংশ। ‘আমি এই অঘ্রানেরে ভালোবাসি’ বলার ভিতর দিয়ে তিনি প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করেন। কেননা তিনি এই প্রকৃতিকে ভালোবাসতে বাসতেই একদিন এই প্রকৃতিতেই বিলীন হবেন। সকলে তাই হয় :

চ’লে যাবো শুকনো পাতা-ছাওয়া ঘাসে- জামরুল হিজলের বনে;

তল্তা বাঁশের ছিপ হাতে র’বে- মাছ আমি ধরিব না কিছু;-

দীঘির জলের গন্ধে রূপালি চিতল আর রূপসীর পিছু

জামের গভীর পাতা-মাখা শান্ত নীল জলে খেলিছে গোপনে;

আনারস ঝোপে ওই মাছরাঙা তার মাছরাঙাটির মনে

অস্পষ্ট আলোয় যেন মুছে যায়;- সিঁদুরের মতো রাঙা লিচু

ঝ’রে পড়ে পাতা ঘাসে- চেয়ে দেখি কিশোরী করেছে মাথা নিচু-

এসেছে সে দুপুরের অবসরে জামরুল লিচু আহরণে,-

চ’লে যায়; নীলাম্বরী স’রে যায় কোকিলের পাখনার মতো

[চলে যাবো শুকনো, রূপসী বাংলা]

সাময়িকী কবিতা

অনেক দিনের জমানো খুচরো দিয়ে শিশু কৃষ্ণচূড়ার আবির্ভাব। সূর্যের আলোয় চনমনে শরীর নিয়ে আনন্দে আত্মহারা। জল ও বায়ুর প্রবাহে

নবগঙ্গা ভাসান

image

তখন খুব ভোর। নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াল কায়সার। নদীর পাড়টা বেশ উঁচু। অনেকটা নিচে শীর্ণ এক জলধারা বয়ে যাচ্ছে। বেশি প্রশস্তও

ভালোবাসার অপর পিঠে বিশ্বস্ত মৃত্যু

image

মৃত্যুর ছয় মাস এগারো দিন আগে মেয়েটির সন্ধান পায় সিনেটর ওনেসিমো সানচেয। রোজাল ডেল ভিয়েরিতে সাক্ষাৎ ঘটে মেয়েটির সঙ্গে।

sangbad ad

‘বালি-বই’ ও তার আশ্চর্য নির্মাণ

image

বোরহেস-এর বিখ্যাত গল্প ‘দ্য বুক অব স্যান্ড’-এ (এল লিব্রো দে আরেনা’) এক অনন্য-সাধারণ বইয়ের লুকিয়ে রাখার কাহিনি আছে।

মার্কেজ : অতীতের সমানবয়সী একাকিত্বের সঙ্গী

image

নিউমোনিয়াকে পরাস্ত করে হাসপাতাল থেকে তিনি ফিরে এসেছেন আগের বাসায়,-আগের সপ্তাহে আমাদের আশ্বস্ত করা এ সংবাদকে বিদায়

বাস্তবের জাদু জাদুর বাস্তবতা

image

গত শতকের শেষ কুড়িটি বছর সমস্ত পৃথিবীই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে থেকেছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলির দিকে। সেইসব দেশের সাহিত্যের

জীবনানন্দের মৃত্যুরহস্য

image

গলিটার মধ্যে একটা ভেজা অন্ধকার। আকাশে চাঁদের আলো আছে কিনা তিনি একবার মুখ তুলে দেখার চেষ্টা করলেন, কিন্তু চোখে পড়ল না। বাতাসে মিশে আছে একটা বিশুষ্ক গন্ধ।

জীবনানন্দ : সময়সাগরতীরে সূর্যস্রোতে নিবিড় নাবিক

image

জীবনানন্দের সমসাময়িক ও পরবর্তীকালের শক্তিমান কবিদের শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রেখেও বলতে হবে

বিপন্ন বিস্ময়ের খোঁজে জীবনানন্দ দাশ

image

মহাসমুদ্রের উচ্ছ্বসিত ঢেউয়ের মতো আধুনিক বাংলা কবিতার সরোবর কাঁপিয়ে দিয়ে যান জীবনানন্দ দাশ।